Search

Saturday, December 27, 2025

আমাদের এক (নি...) ভিসি!

একটা দেশ সম্বন্ধে জানতে হলে প্রথমে তাকাবেন এয়ারপোর্টের দিকে, এরপর শিক্ষাঙ্গন। কে চালাচ্ছে, কীভাবে চালাচ্ছে?

ভাবা যায়, ইনি  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০তম ভিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। প্রায় ৪৫ হাজার  ছাত্র-ছাত্রীর মা-বাপ!
ইনি এই ভিডিও ক্লিপে বলছেন:
প্রথম শিশু মুক্তিযোদ্ধা হচ্ছেশিশু তারেক, শিশু আরাফাত!

এই যে ইতিহাস বিকৃতি, এই যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসত্য প্রলাপ, এই কারণে এই মানুষটার শাস্তি হবে না?


বেচারা, মনে হয় তারেক জিয়ার বাসের সামনের উইন্ডশিল্ড-এর উপর দিয়েই  হ্যান্ডশেক করতে চেষ্টা করেছিলেন। হ্যান্ডশেকের বদলে 'গলাশেক' মানে গলাধাক্কা খেয়েছেন। বেচারা!

* সদয় অবগতি: (নি...) দিয়ে 'নিরীহ' হয়, (নি...) দিয়ে নির্ভিক হয়, 'নির্বোধ'ও হয়। প্রয়োগ পাঠকের বিবেচনা...।

Thursday, December 25, 2025

আমাদের এক দানব, শহিদুল আলম!


* কৃতজ্ঞতা, স্ক্রিন শট: জনাব, শহিদুল আলমের ফেসবুক পোস্ট। 

The tree that the corpse of Dipu Chandra Das was hung from and set on fire, was in the divider in the middle of a busy road. It happened in public and was allowed to happen! 

দিপু চন্দ্র দাস নামের নিরীহ একটা মানুষকে ধর্মের দোহাই দিয়ে পিটিয়ে, উলঙ্গ করে, প্রকাশ্যে গাছে ঝুলিয়ে, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছে এবং শত-শত মানুষ যে ভঙ্গিতে ভিডিও করেছে তা এই গ্রহের কোন যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা চলে না। 


কেবল তাই না, তাঁর লাশ সৎকারেও বাধা দিয়েছে, তাঁর স্বজনদেরকেও আহত করেছে!

কিন্তু আমাদের মহান শহিদুল আলম এর-এক 'মহা চুতিয়া' ব্যাখ্যা দিয়েছেন!

I understand how angry people are and the resentment towards the authoritarian Sheikh Hasina and her regime, as well as against India for sheltering killers, ...

ইনি নাকি বুদ্ধিজীবী! ইনি নাকি মানবিক মানুষ! আমার কাছে শহিদুল আলমকে মনে হচ্ছে, এ স্রেফ একটা চলমান দানব! মানবের ছাল গায়ে এক দানব!

এদিকে আবার মানবিক পাগড়ি জড়াবার চেষ্টা করছেন এটা বলে:

but we cannot replicate the fascist behavior ourselves. That is not the Bangladesh we dream of...

অথচ তিনি বাটন-ফোন ব্যবহার করতেন। এবং কোথাও এই তথ্য পাওয়া যায়নি তিনি 'সো-কলড' ধর্মীয় অবমাননা করেছেন! এখন যারা তাঁকে এমন নির্মম ভাবে পিটিয়ে মেরেছে, তাঁকে জীবিত ফিরিয়ে দিলেই হয়! 


এদিকে মুফতি কাজি ইব্রাহিম যখন বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির কথা কোরানে আছে, সুরা ইউসুফে, তখন কিন্তু তৌহিদি জনতা কাজি ইব্রাহিমের গোপন কেশও স্পর্শ করতে পারেনি!

একজন দিপু চন্দ্র দাস কেমন করে সময়কে থামিয়ে দেন, কেমন করে একটা সভ্যতাকে অন্ধকার ভুবনে নিয়ে যান, কেমন করে গোটা একটা দেশকে উলঙ্গ করে দেন তা ছোট্ট এই ভিডিও ফুটেজে ফুটে উঠে।

** যে-কাউকে আমি নিষেধ করব এই ভিডিও ক্লিপটা দেখার জন্য। এটা দেখে কেবল আমার মনে হচ্ছিল, ইচ্ছামৃত্যু থাকাটা খুব জরুরি ছিল!এই পোস্টের একদম নীচে দিয়ে দিচ্ছি যাতে চট করে কারো চোখে না পড়ে।

কিন্তু, তবুও চাচ্ছি, এখানে থাকুক এটা। বাস্তবে আমরা আসলে কেমন এটা বুঝতে খানিকটা সুবিধা হবে...।

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.

.



Tuesday, December 16, 2025

আহারে পতাকা এবং আমাদের বিজয় দিবস—স্বাধীনতা দিবস!

গত ২৬শে মার্চে যে লেখাটা লিখেছিলাম, পতাকা ছিনতাই [], ঠিক এই লেখাটাই হুবহু কপি-পেস্ট করে এখানে বসিয়ে দেওয়া যায়!

আহা, আহারে বেচারা পতাকা! ওদিন ২৬ মার্চে চারপাশে কোথাও পতাকা ছিল না, আজ ১৬ ডিসেম্বরও একই! দক্ষিণ-পশ্চিম-উত্তর-পূর্ব, কোথাও নাই!





কোনটা যে ঠিক আর কোনটা যে বেঠিক জলের সঙ্গে পানি মিশে একাকার:



মুক্তিযুদ্ধের 'জয় বাংলা' যেমন করে আওয়ামী ট্যাগ খেয়ে অস্পৃশ্য হয়ে গেল তেমনি গতি হচ্ছে পতাকার—এক টুকরো কাপড়!

কেউ-কেউ জাঁক করে বলার চেষ্টা করে, ২৪ বড়, না ৭১? ওরে চুতিয়া, তার চেয়ে বল, ছেলে বড়, না বাপ বড়?

এদের আস্ফালন দেখার মত। এ বলছে মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ ইতিহাস মিথ্যা! [১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫]:


রাজাকার তো দূরের কথা ভবিষ্যতে 'র' শব্দও উচ্চারণ করা যাবে না:



অল্প শিক্ষিতদের নাহয় বাদ দিলাম কিন্তু একজন শিক্ষক যখন এমনটা বলেন তখন তাকে 'অমায়িক চুতিয়া' না-বলে পারা যাচ্ছে না!

এই যে আরেকটা, ব্যা, ব্যা ফুয়াদ। এই বদ্ধ উম্মাদ বলছে,
১৬ ডিসেম্বরকে আমি বিজয় দিবস মানি না!
আমি ভয়ে-ভয়ে আছি, কোন দিন না এ বলে বসে আমি আমার বাপ-মার কাবিননামা মানি না! অতঃপর; ইশ, ভয়ে আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি...!

এই দেশে নষ্ট হওয়ার প্রতিযোগতায় কেউ পিছিয়ে নেই! মুক্তিযোদ্ধা আখতারও ভেসে থাকা ভেসে থাকা 'ইয়ে' সরিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসেন :


৭১-এ এরা যেমন ধর্মকে বিক্রি করত ২৫-এ তাই! ভাবা যায়, একজন ব্যারিস্টার, বিলাত থেকে পড়ে আসা একজন মানুষ বলছে, জান্নাতে যেতে চাইলে জামাত-ই-ইসলাম করতে হবে:


একজন সাদি মহাম্মদ মরে বেঁচে গেছেন। গা ঘিনঘিনে গু-পোকাদের এই ক্ষমতা নাই একজন সাদি মহাম্মদের কষ্ট ধারণ করে। একজন ইমতিয়াজ বুলবুলকে স্পর্শ করতে পারে:


সব কিছু ভেঙে পড়ে তবুও এমন অপার আনন্দের দৃশ্য যখন দেখি তখন আশায় বুক বাঁধি:


সূত্র:
০. পতাকা ছিনতাই https://www.ali-mahmed.com/2025/03/blog-post_26.html?m=1

১. সাদী মহাম্মদhttp://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html
২. মশিহুর রহমানhttp://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html
৩. সুরুয মিয়াhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৪. উক্য চিংhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8752.html
৫. ভাগিরথীhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6057.html
৬. প্রিনছা খেঁhttp://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_27.html
৭. রীনা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_7644.html
৮. দুলা মিয়াhttp://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_08.html
৯. মুক্তিযুদ্ধে, একজন ঠেলাওয়ালাhttp://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_18.html 
১০. মুক্তিযুদ্ধে  সুইপার: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8807.html
১১. নাইব উদ্দিন আহমেদhttp://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_2292.html
১২.  একজন ট্যাংকমানবhttps://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html  
১৩. ফাদার মারিনো রিগনhttp://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_7597.html
১৪. শুয়োর চড়ানো একজন...:  https://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_1.html?m=1
১৫. লালুhttp://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post.html

...



Sunday, December 14, 2025

জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি...

লেখক: Ibrahim khalil Sobak (সবাক): (https://www.facebook.com/share/1BbMt6XzyB/) [লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে]

"জরুরি সংবাদপত্র বহনকারী সিএনজিতে করে ফিরছিলাম। ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়াতেই দু'পাশে দু'টি মোটরসাইকেল এসে থামে। তারপর গুলি করে। আমি সিটের ওপর ঢলে পড়ি। উপস্থিত সাধারণ মানুষ এসে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার আমাকে মৃত ঘোষণা করেন। ব্যাপারটা নিশ্চয় আপনি জানেন?

তিনি বলেন, 'হ্যাঁ, জানি-জানি। ঘটনা দুপুরে ঘটেছে, তাই তো'?

আমি বলি, 'জ্বি'।

'সেক্ষেত্রে তোমার জন্য জুরাইনে দাফনের জায়গা করা হয়েছে, তুমি সেখানে চলে যাও'?

'এখনই যেতে পারবো না। আমার একটা জরুরী কাজ আছে'।

তিনি আবারও বলেন, 'সব কাজ শেষ না-করে এভাবে মরতে গেলে কেন? এখনতো ঝামেলা হয়ে যাবে'!

আমি কাতর হয়ে বলি, 'দেখুন, আমার ছেলে জানালা দিয়ে খেলনা কবুতর ফেলে দিয়েছে। কেউ তাকে সেটা তুলে এনে দেয়নি! এখন সে কান্না করছে। ...আচ্ছা, আমার ছেলের নামটা যেন কী? না থাক, আপনি বরং আমার বাসার ঠিকানাটা বলুন, আমি বাসায় যাব। বিশ্বাস করুন তাকে খেলনা কবুতরটা তুলে এনে দিয়েই সোজা জুরাইন চলে যাব। কসম'!

তার চোখে খানিকটা অবিশ্বাস, 'কিন্তু, তুমি যে ঠিকঠাক জুরাইনে গিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বে, তার গ্যারান্টি কী? রেকর্ড দেখে তো তখন মনে হয় না পৃথিবীতে তোমার কোনো কাজকর্ম আছে; সবসময় একজন কর্তব্যহীন দাসের মতো গায়ে বাতাস লাগিয়ে হাঁটতে। এখন এসব বলে কোনো লাভ হবে না, বলো'!

'কিন্তু, আমার বাসার ঠিকানা তো এত দীর্ঘ না। ঠিকানার আগে পরে কোনো প্রশ্ন অথবা আশ্চর্যবোধক চিহ্ন নেই। আপনি কি আমার সাথে প্রতারণা করছেন'?

তার কন্ঠে খানিকটা উষ্মা, 'কথা না বাড়িয়ে তুমি এখনই জুরাইন চলে যাও—যত দ্রুত সম্ভব। শহরের মানুষজন টের পেলে একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। মৃত্যুর পর এভাবে টং দোকানে বসে চা খাওয়া যায় না, বুঝলে! এটা উচিত না!

'দেখুন, আমাকে বাসায় যেতেই হবে। আমার ছেলের সাথে ওই কবুতরের টান আছে। কবুতরের ঠোঁটে সে চুমু খায়, বুকে নিয়ে ঘুমায়। আমি না-গেলে আর কেউ বাসার পেছন থেকে তার এই ভালোবাসার কবুতরটা এনে দেবে না। কবুতর এনে না-দিলে আমার ছেলেটা ঠিকমতো খাবে না, ঘুমাবে না। অনিয়ম করতে করতে সে শুকিয়ে যাবে, শরীর নষ্ট হয়ে যাবে।

তার বড় তাড়া, ' শোনো, এখান থেকে ...ওই যে লাল বাসটায় উঠলে তোমাকে জুরাইন নামিয়ে দেবে। বাসের কেউ তোমাকে দেখবে না, কন্ডাক্টরও ভাড়া চাইবে না। কবরস্থানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি নতুন কবরের পাশে নেমে যেও'।

আমি বিরক্তি গোপন করে বলি, 'আমার বাসার ঠিকানা না-দিয়ে আপনি চায়ের অর্ডার দিচ্ছেন কেন? এই... এই... আপনি চা খাবেন না, বাসায় যাওয়ার জন্য আমাকে কোন রঙের বাসে উঠতে হবে বলুন, আমি পাশাপাশি দুটি জারুল ফুলের গাছ দেখে আমার বাসা চিনে নেব; আপনি শুধু বাসটা ধরিয়ে দিন'।

'লাল বাস! জুরাইন যাওয়ার জন্য লাল বাসে উঠতে হবে'।

'আহা, প্রতারণা করবেন না। আপনি সিগারেট ধরাবেন না। কোন রঙের বাসে উঠে বাসায় যাব, বলুন। এক্ষুনি বলুন'!

তিনি এবার নরোম গলায় বলেন,  'জুরাইনগামী লাল রঙের বাসটি দাঁড়িয়ে আছে, তুমি যাও। আরে, যাও তো'!

'এই, এ-এ-এই..., আপনি কিন্তু এখনই দোকানদারের টাকা শোধ করবেন না। দোকানদারকে টাকা দিয়ে চলে যাবেন না। দয়া করে আপনি আরও এক কাপ চা খান, আরও একটি সিগারেট ধরান। আরও এক দণ্ড... এই যে, এখানটায়... এখানটায় বসুন। আর আমার বাসার ঠিকানাটা দিন।দোহাই লাগে, এভাবে চলে যাবেন না। বাসার ঠিকানাটা দিয়ে যান।

দেখুন, আমাকে বাসায় যেতেই হবে। আমার ছেলের সাথে ওই কবুতরের প্রেম আছে। কবুতরের ঠোঁটে সে চুমু খায়, বুকে নিয়ে ঘুমায়। আহা, আমি না-গেলে আর কেউ বাসার পেছন থেকে তার ভালোবাসার কবুতর এনে দেবে না। কবুতরটা এনে না-দিলে আমার ছেলে ঠিকমতো খাবে না, ঘুমাবে না। অনিয়ম করতে করতে সে শুকিয়ে যাবে, নষ্ট হয়ে যাবে।

বুঝলেন, আমাকে বাসায় যেতেই হবে। আমার ছেলের সাথে ওই কবুতরের প্রেম আছে। কবুতরের ঠোঁটে সে চুমু খায়, বুকে নিয়ে...।"

(২০১৩ সালে যখন মৃত্যু তাড়া করে ফিরতো, তখন লেখা)

-লেখক: Ibrahim khalil Sobak (সবাক): (https://www.facebook.com/share/1BbMt6XzyB/)

Sunday, December 7, 2025

স্মরণে, আবুল হাসান।

লেখক: মুহম্মদ নিজাম (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে)

"একবার খুব মদ খেয়ে মাতাল হয়ে নর্দমায় পড়ে গিয়ে বাজখাঁই গলায় কৈফিয়ত চেয়েছিল:

"আকাশ এত নোংরা কেন রে, বাঞ্চোৎ?"

গালিটা সে কাকে দিয়েছিল, জিজ্ঞেস করেনি কেউ। উত্তরটা তাই অজানাই রয়ে গেলো!

আবুল হাসান নামে এক আশ্চর্য নীলকন্ঠ কবি এসেছিল একবার আমাদের শহরে। সে বলতো: 

"..মানুষ 

যদিও বিরহকামী, 

কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।"

আবুল হাসান মারা গিয়েছিল আমাদের চেয়েও কম বয়সে। বেঁচে থাকলে এখন নিশ্চয়ই কেউ তাঁকে পাকিস্তানের দালাল বলতাম; কেউ বলতাম, ভারতের দালাল। 

ডানে গেলে বামের কামড়, বামে গেলে ডানের। 

মরে গিয়ে বেঁচে গেলো 'মালটা'!

সেও হয়তো গুণের মতো পুরষ্কার ভিক্ষা চেয়ে নিন্দিত হতো, কিংবা 'তুই রাজাকার' শ্লোগান দিয়ে 'শাহবাগী তুই গোসল কর', জাতীয় উষ্মাভস্মে চাপা পড়ে যেতো। 

কিংবা আমীর হামজার মতো রসময় সুরে 'রেশমিকা মান্দানা' বাজাইতো। হয়তো আগস্টের সেই দিনগুলিতে মেট্রো ভাঙার কিংবা বিটিভি পুড়ানো দুঃখে কাতর হয়ে উঠতো—কিংবা মাজারভাঙা এনার্কিস্টদের দিকে তাকিয়ে তীব্রস্বরে বলে উঠতো, 'আবার তোরা মানুষ হ'!

বেঁচে থাকলে কি হতো, আমরা জানি না। তবে যাই হতো, মন্দ-ই হতো এইটা নিশ্চিত জানি!

শুনেছি, লোকটা খুব সুর করে কোরআন পড়তে জানতো। প্রায়ই শোনাতো নাগিরক জলসায়, এখানে-সেখানে..., এমনকি ওর প্রিয়তম মেয়েটির বাবাকেও! 

মানুষ যদিও জীবনেই অমরত্ব খোঁজে, কিন্তু একমাত্র মৃত্যুই তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

মরে গিয়ে বেঁচে গেলো লোকটা?

'যাই' শীর্ষক ওঁর একটা কবিতা ছিল। একাত্তরের কবিতা। দূরসঞ্চারী এক বিষাদের সুরে বলেছিল,

'যাই, এখন তাদের শরীরে শস্যের আভা ঝরে পড়ছে যাই...

মৃত্যু আর মৃত্যু আর মৃত্যুর আঁধারে যাই,

বিবর্ণ ঘাসের ঘরে ফিরে যাই, যাই

সেখানে বোনের লাশ, আমার ভাইয়ের লাশ খুঁজে নিতে হবে যাই,

আমি যাই-'

শুনেছি,  একাত্তরের সেই ঘাতক-হানা রাতে ঢাকা মেডিকেলের কোন-একটা নোনাধরা কামরায় শুয়ে-শুয়ে অসুখের সাথে সংসার করছিল। কিন্তু অসুখটা সারে নাই। এই অসুখেই পঁচাত্তরে মারা গেলো। তখনই কতই বা ওর বয়স? মাত্র আটাশ!

আটাশে নিঃসঙ্গ যুবক জেনে গিয়েছিল, 

"মানুষ একা 

মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ একা!"

চেয়েছিল, পাখি হয়ে যাক প্রাণ।তারপর পাখি হয়েই উড়ে গেলো অনন্ত আলোকের দেশে। 

গতকাল আমার এক বন্ধুকে ওঁর একটা ছবি দেখালাম। সে বললো, 'শাহাবাগীদের মতো লাগে'! তারপর ওঁর কিন্নরী সুরে কোরআন পাঠের কাহিনী শুনালাম, সে বললো, 'তাইলে, নিশ্চয়ই শাপলা ছিল'!"

চিন্তা করেন অবস্থা!

গতরাতে, অনেক রাতে, বৃষ্টিতে কাকভেজা, ভিজে-ভিজে ফেরার পথে পড়ছিলাম আবুল হাসানের অমৃত অসুখের কথা, 

'ঝিনুক নীরবে সহো 

ঝিনুক নীরবে সয়ে যাও

ভেতরে বিষের বালি

মুখ বুঁজে মুক্তো ফলাও!' 

আর ভাবছিলাম, 'মরে গিয়ে বেঁচে গেলে, হে মহান প্রতিভা'!"

- লেখক: মুহম্মদ নিজাম 

বাংলাভূমি, সেপ্টেম্বর ২০২৫"

Tuesday, December 2, 2025

অজ্ঞ বাউল বনাম আমাদের বিজ্ঞজন...!

একজন বাউলের পালাগান-বিচারগান নিয়ে দেশ উত্তাল—কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে!

এখানে বাউল আবুল সরকারের একটা ক্লিপ দিচ্ছি। এখানে প্রসংগক্রমে 'সুরা নাসের' [*]কথা বলা হয়েছে:


এটা অনেকের ধর্মানুভূতিতে মারাত্মক আঘাত করেছে। এই ভিডিও ক্লিপটা খুব ভাল করে দেখা-শোনার পরও কারও যদি এমনটা মনে হয়ে থাকেও, এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করার খুব একটা ইচ্ছা আমার ছিল না:

কিন্তু..., এই ক্লিপটা দেখার পর মনে হচ্ছে খানিকটা বাতচিত করাটা জরুরি। এই মানুষটার নাম-বিস্তারিত জানি না এই কারণে গভীর দুঃখ প্রকাশ করি। কিন্তু মানুষটা পোশাক দেখে অনুমান করি 'ওটির চাপরাশি' টাইপের কেউ হবেন না, ডাক্তারই হবেন কারণ ইংরেজিতে খই  ফোটাচ্ছেন।

বেচারা! এপ্রোনটা খোলারও সময় পাননি! আশা করছি, অপারেশনটা শেষ করার পর-পরই 'শব্দের গোলা' দেগেছেন। 'খোদা-না-খাস্তা' অপারেশনটা অসমাপ্ত রেখে বা জোশের চোটে অক্সিজেনের পাইপে পা রেখে থাকলে রোগির তো 'রাম-নাম সাত্যা' হয়ে গেছে।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, এই পৃথিবীতে হাজারো বিষয় থাকতে ধর্মীয় বিষয় এড়িয়ে যাওয়াটাই সমীচীন কারণ আমাদের বাপ-দাদাদের চেয়ে আমরা এখন অনেক ধার্মিক হয়ে গেছি!

আমি এটা বলছি না, বাউল আবুল সরকার সমস্ত সমালোচনার বাইরে তাঁর সমালোচনা করেন, কঠিন সমালোচনা করেন, সমস্যা নাই। 

তবে, প্রত্যেকের জন্যই এটা মানাটা জরুরি, আপনি কি বলছেন, কেন বলছেন, কোথায় বলছেন, কার সঙ্গে বলছেন, কোন সময়ে বলছেন! এটুকু সেন্স না-থাকলে মুখ না-খোলাটাই সমীচীন।

তাঁর সহধর্মিণী এবং সহশিল্পী আলেয়া বেগম বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন। কী অসাধারণ তাঁর বোঝাবার ভঙ্গি! আমি কান পেতে রই।


আজ যারা তাঁকে বা বাউলদের নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছেন এবং কী সগর্বেই না বলা হচ্ছে, 'আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, বাউলদেরকে গণধোলাই দেওয়া হচ্ছে...':

বেশ-বেশ! আচ্ছা, বাউল-টাউল ব্যতীত অন্যদের নিয়ে আপনাদের ধর্মানুভূতি কাজ করে না? আজ 'মুসলমানদের কবি' কাজী নজরুল ইসলাম বেঁচে থাকলে কতশত বার যে বাতাসে তার বাবরি চুল উড়ত, কল্লাসহ; তার ইয়াত্তা নাই। নমুনা []:


এখানে এসে আমাদের 'ধর্মানুভুতি কবিরা' এপ্রোন খুলে নিরব হয়ে যান!
বা ধরুন, তাঁর (কবি কাজী নজরুল ইসলাম)-এর এই সমস্ত অনুবাদ:


ভাগ্যিস, কাজী নজরুল ইসলাম যে 'রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম' থেকে অনুবাদ করেছেন তার স্রষ্টা আজ আর বেঁচে নেই! ওমর খৈয়াম মরে বেঁচে গেছেন! এবং বঙ্গালদেশে জন্ম না-নিয়ে ইরানে জন্ম নিয়েছিলেন বলে দ্বিতীয় বার বেঁচে গেছেন! নইলে তাঁর লাশ কবর থেকে তুলে আগুন দেওয়া হতো।
আচ্ছা, আবুল সরকারের নাহয় ধর্মীয় জ্ঞান বা ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নেই কিন্তু আমাদের ধর্মীয় শিক্ষকদের তো অগাধ জ্ঞান ধর্মের প্রতি আকাশসম শ্রদ্ধা। এই যে মাওলানা সাহেব বলছেন, "আল্লাহ চাঁদাবাজ...":


বা, এখানে:
ধর্মীয় বক্তা আজহারি অবলীলায় আল্লাহ-নবির সঙ্গে 'শালা-হালা' লাগাচ্ছেন। আজহারির ইয়ের-কেশ, মাথার—কেউ স্পর্শ করেছে!

ইয়ে, ওই যে ডাক্তার সাহেব একেকটা আগুনের গোলা ছুড়ে দিলেন এটা শুনে কী তার 'ইয়েভূতি' আহত হয়নি?
অথবা, এই যে বিএনপি পন্থি লোকটা বললেন:
"জিয়াউর রহমান কোরান শরীফে বিসমিল্লাহ-হির-রাহমানির-রাহিম সংযুক্ত করেছিলেন":
এই মানুষটা কী এখনও মুক্ত ঘুরছেন?

আর আরেক ধর্মীয় শিক্ষক জামাতে ইসলামের এম. পি প্রার্থী আমির হামজা বলছেন,
"এখন যদি বলি, আল্লাহ 'কোরান-এ কারিমে' ফেসবুক কিভাবে চালাবেন, দিয়েছেন, বিশ্বাস করবেন?...সুরা আম্বিয়ার ৮৩ নম্বর আয়াত..." :
এমনকি, আমির হামজা আরও বলছেন, "লাইক-শেয়ার-কমেন্ট এই সমস্ত  কথাও আল্লাহ ১৫০০ বছর আগে কোরানে দিয়েছেন"।

কেউ কি এই মানুষটার ঘাড় ধরে জানতে চেয়েছে কোরানের কোথায় আছে এটা, দেখা? সুরা আম্বিয়ার ৮৩ নম্বর আয়াত এটা:

সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৩ ।  কোরানশরিফ, বঙ্গানুবাদ: মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান 

এই সমস্ত কারণে এই মানুষটাকে কী কেউ বাউলদের মত পানিতে চুবিয়েছে বা ফাঁসি দাবী করেছে?

মিজানুর রহমান আজহারির ওয়াজের নামে এই সমস্ত অনেক বক্তব্য'র জন্য 'তাওহাদি জনতা' কী কোন হইচই করেছে! আটকাতে-লটকাতে চেয়েছে?

কবরে নাকি রাজনৈতিক সাওয়াল-জাওয়াব হবে:

ধর্মীয় শিক্ষক-ধর্মীয় বক্তাদের এমন অজস্র উদাহরণ দেওয়া যাবে কিন্তু এখানে এসে 'তাওহাদি কবি' নিরব... []!

সূত্র:

১. দুখু মিয়া, সুখু মিয়াhttps://www.ali-mahmed.com/2015/05/blog-post_25.html?m=1

২. ওয়াজ সমগ্রhttps://www.ali-mahmed.com/2019/04/blog-post.html?m=1

* সুরা নাস (রুকু: ১, আয়াত: ৬) ১. বলো, আমি শরণ নিচ্ছি মানুষের প্রতিপালকের, ২. মানুষের অধীশ্বরের, ৩. মানুষের উপাস্যের, ৪. তার কুমন্ত্রণার অমঙ্গল হতে, ৫. যে সুযোগমত আসে ও সুযোগমত সরে পড়ে, যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, ৬. জিনের মধ্য থেকে বা মানুষের মধ্য থেকে। -কোরান শরীফ


Thursday, November 27, 2025

তবলার ঠুকঠাক—গুমের আগমনী বার্তা!

লেখক: মিজানুর রহমান সোহেল (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

"আলহামদুলিল্লাহ! বিনা অপরাধে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে থাকার পর তারা আমাকে স্বসম্মানে মাত্র বাসায় পৌঁছে দিয়েছে।

গত রাত ১২টার দিকে ডিবি প্রধান আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এই অজুহাতে ৫/৬ জন ডিবি সদস্য জোর করে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ডিবিতে নিয়ে আসামীর খাতায় আমার নাম লেখা হয়। জুতা-বেল্ট খুলে রেখে গারদে আসামীদের সাথে আমাকে রাখা হয়। কিন্তু কেন আমাকে আটক করা হলো? তা আমি যেমন জানতাম না, তেমনি যারা আমাকে তুলে এনেছিলেন বা ডিবির উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও কিছু বলতে পারেননি!

দীর্ঘ সময় পর বুঝতে পারলাম, সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র ৯ জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ার জন্যই আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার সাথে সংগঠনের সেক্রেটারি আবু সাঈদ পিয়াসকেও আটক করা হয়। তিনি এখনও ডিবি কার্যালয়ে আছেন।

আজ (বুধবার) ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) নিয়ে ডিআরইউতে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর প্রেস কনফারেন্স করার কথা ছিল। আমি সেখানে ছিলাম মিডিয়া পরামর্শক। সেই প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল। কিন্তু তাদের জন্য আফসোস, যে উদ্দেশ্যে তারা প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতে চাইলো সেটা দেশের সবাই জেনে গেলো।

দেশের মুক্ত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে এনইআইআর স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে প্রতিযোগিতা কমিশনও রয়েছে। অথচ মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারাদেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ, প্রবাসীসহ অনেকেই বিপদে পড়বেন। একটা চেইন ভেঙ্গে পড়বে। অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে। জেনে রাখা ভালো, এই ৯ জনের একজন ওই উপদেষ্টার স্কুল-বন্ধু।

একটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে সরকার কেন ভয় পায়? শুধুমাত্র প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতেই কি আমাকে গভীর রাতে জোর করে তুলে নিতে হলো? যারা মুখে ‘বাকস্বাধীনতা’র বুলি আওড়ান, তারাই কি আমাকে বাকরুদ্ধ করতে এই আয়োজন করলেন? মগের মুল্লুকে এই কি তবে বাকস্বাধীনতার বাস্তব চিত্র?

আমাকে আটক করার ঘটনা জানাজানি হতেই বহু শুভাকাঙ্ক্ষী, ভাই, বন্ধু, সহকর্মী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। অনেকেই খবর নিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিয়েছেন, বিবৃতি দিয়েছেন, সংবাদ প্রকাশ করেছেন। তাদের এই সমর্থন ও আওয়াজের কারণেই আমি দ্রুত মুক্তি পেয়েছি বলে বিশ্বাস করি। যারা আমার পাশে ছিলেন তাদের সবার প্রতি আমার অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।

...

ডিবিতে আমার খাবার মেন্যুতে কী ছিল?


১৯ নভেম্বরের গভীর রাত। শীত ঠিক পুরোপুরি নামেনি, তবু বাতাসে একটা ঠান্ডা খচখচে ভাব। শহরটা যেন ঘুমের ভিতরেও ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলছে। এমন সময় হঠাৎ আমার দরজায় অচেনা কড়া। প্রথমে ভাবলাম হয়ত ভুল দরজা। কিন্তু দ্বিতীয় কড়া আরো কঠিন, আরো স্পষ্ট। বুঝিয়ে দিল, এ রাতের ছন্দ বদলে গেছে। দরজা খুলতেই দেখি কয়েকজন অপরিচিত মুখ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ ডিবি পরিচয়ে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের কঠোর নির্দেশ ও নিয়ম অনুযায়ী কাউকে আটক করতে হলে স্থানীয় থানাকে জানানো বা আইডি কার্ড প্রদর্শনের যে বিধান রয়েছে, তার কোনোটিই মানা হয়নি। উল্টো ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এমন একটি প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঘড়ির কাঁটা এক জায়গায় আটকে থাকার মতো সময় যেন থমকে গেল। প্রশ্ন, নীরবতা, অপেক্ষা সবকিছু মিশে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে স্তব্ধ থাকলাম।

এসব গল্প এখন পুরনো। তবে ডিবি থেকে বাসায় ফেরার পর একটি অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করলাম। সবার মুখে একটাই কৌতূহলী প্রশ্ন, ‘ডিবিতে আপনার খাবার মেন্যুতে কী ছিল'? বিদেশি একটি গণমাধ্যম আমার সাক্ষাৎকার নেয়ার সময়ও এই প্রশ্ন করেছে। গতকাল একটি টেলিভিশনের টক-শোতেও দেখলাম আমার খাবার মেন্যু নিয়ে বিজ্ঞজনরা আলোকপাত করছেন!

এমনকি ফেসবুকের জনপ্রিয় পেজ ‘ইয়ার্কি’ পর্যন্ত রসিকতা করে লিখেছে ‘ভাতের হোটেল সার্ভিস বন্ধ, ডিবি এখন 'উঠাও' সার্ভিস চালু করেছে।’ আসলে আমরা বাঙালিরা বড্ড ভোজনরসিক। সুখে খাই, দুঃখে খাই, প্রেমে পড়লে খাই, ছ্যাঁকা খেলে খাই, কেউ জন্ম নিলে খাই, মারা গেলেও খাই... শুধু খাই আর খাই। হয়তো এই সাইকোলজি বুঝেই ডিবি হারুন ‘ভাতের হোটেল’ খুলেছিলেন। তাই আমার আটকের পর সবার আগ্রহ ছিল, হারুনের হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ হওয়ার পর নতুন মেন্যুতে কী যোগ হলো?

মেন্যু আইটেম ১, পানি:

বাসা থেকে ডিবি কার্যালয়ের দূরত্ব খুব বেশি না, কিন্তু অনুভূতিতে সেটা যেন একটা যুগ। কারণ অন্ধকার রাতে অজানা যাত্রা সবসময় বুকের ভেতর একটা শূন্যতা তৈরি করে। আমাকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়ার পর পরই ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। তড়িঘড়ি করে আসামির খাতায় নাম তুলে, বেল্ট-জুতা খুলে শরীর তল্লাশি করে আসামিদের গারদে ঢোকানো হয়। ডিবির লোকজনের রুক্ষ ব্যবহার আর ধমকে আমি তখন রীতিমতো চোখে সরষে ফুল দেখছি। গারদের ভেতরে অচেনা মুখ। কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই, কী মামলায় আইছেন?’ আমি তো জানিই না কেন এসেছি!

আমার অজ্ঞতা দেখে আরেক বন্দি রায় দিলেন, ‘তাইলে নিশ্চিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হবে আপনার নামে।’

ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ, কথা বের হচ্ছে না। আমি পানি চাইলাম। কেউ একজন পানির বোতল এগিয়ে দিলেন। ডিবিতে আমার প্রথম খাবার, এক চুমুক পানি।

কিছুক্ষণ পর ডিবির প্রধান এসে আমার সঙ্গে কথা বললেন। এরপর আবার আমাকে তার রুমে ডেকে পাঠালেন। দ্বিতীয়তলায় তার রুমে যাওয়ার পর আমাকে দাঁড় করিয়ে পরেরদিন প্রেস কনফারেন্সের বিষয়ে জানতে চাইলেন। তখন আমি আসল কারণ জানতে পারলাম কেন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। আমন্ত্রণপত্রে আমার নাম্বার নাকি ভুলভাবে দেয়া হয়েছে এ জন্য আমাকে ডেকেছেন।

ডিএমপি মিডিয়া সেল থেকে আরো একধাপ এগিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আমার নাম্বার নাকি সংবেদনশীল জায়গায় ব্যবহার করা হয়েছিল বলে আমাকে রাতের অন্ধকারে উঠিয়ে আনা হয়েছিল। যদিও আমি তাদের বলেছিলাম, ভুল করে আমার নাম্বার ব্যবহার হয়নি, আমি জেনে, বুঝে, সুস্থ মস্তিষ্কে এই নাম্বার আমন্ত্রণপত্রে দিয়েছিলাম, যাতে কোনো সাংবাদিক চাইলে প্রেস কনফারেন্স ইস্যুতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। এটা যে আমার পাবলিক রিলেশনস এজেন্সি টাইমস পিআর-এর ইনভাইটেশন সেটা আমন্ত্রণপত্রের উপরে আমার প্রতিষ্ঠানের লোগো থাকার পরেও হয়তো তারা বুঝতে পারেনি।  

মূলত তারা এই প্রেস কনফারেন্স করতে দিতে চান না। একটি সিন্ডিকেটকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ার জন্য নীতিগত যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, তাতে বিরাট সংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথে বসে যাবেন। যারা দেশের আইন মেনে, লাইসেন্স নিয়ে, সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে প্রকাশ্যে ব্যবসা করেন। এমনকি সরকারি ব্যাংক তাদের ব্যবসার বৈধতা যাচাই-বাছাই করে ঋণও দেয়। তারা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর)-এর বিরুদ্ধে না। শুধু এনইআইআর বাস্তবায়নে অন্য বড় ব্যবসায়ীদের মতো নিজেদের ব্যবসা করার সমান সুযোগ চান।

এ বিষয়ে নিজেদের মতামত, প্রস্তাবনা ও দাবির কথা সাংবাদিকদের বলবেন, সেটা উপর মহল নিতে পারবেন না কেন? এ দেশের মানুষকে কথা বলার অধিকার তো সংবিধানই দিয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করে এই কথা বলার অধিকার হরণ করেছিল। সেটা এই সরকার বাতিল করেছে বলে দাবি করলেও একই কায়দায় কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা কার স্বার্থে করা হচ্ছে? শুধু মতামত দিবে বলে তাদের মুখ চেপে ধরতে হবে? তাদের কথা বলতে দেয়া যাবে না? এই যে ডিবির নতুন প্রধান বা যে বিশেষ সহকারীর দিকে অভিযোগের তীর যাচ্ছে, তারাও এসব পদে এসেছেন আগের সরকারের সময়ে কেউ কথা বলতে চাইলে তাদের মুখ চেপে ধরতো বলে। অথচ গদিতে বসেই তারা সব ভুলে গেলেন! 

ডিবির প্রধানের সঙ্গে আমার কথা বলা শেষ হওয়ার পর তিনি একজন ডিসিকে বললেন, ‘উনাকে ভাত-টাত খাওয়ায়ে ছেড়ে দিয়েন।’ এটা শুনে আমার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে ডিবি হারুনের সেই ‘ভাতের হোটেল’ ভর করল। ডিবি হারুনের ভাতের হোটেল কি তাহলে এখনও খোলা? ভাতের হোটেলে মেন্যুতে কি কি আছে? এত রাতেও কি গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত পাওয়া যাবে? এসব ভাবতে ভাবতে হেঁটে ডিসির রুমে পৌঁছে গেলাম। ডিসি আমার সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন। কী খাবেন? জানতে চাইলেন তিনি। আমার গলা তখনও শুকনো। শুধু পানি চাইলাম। আরেক দফা পানি খেলাম। তবে আমি ডিনার করতে একদম আগ্রহ দেখালাম না। 

মেন্যু আইটেম ২, চীনা বাদাম:  

ডিসি আমাকে জানালেন তিনি অনেক ক্ষুধার্ত। একজনকে ডেকে ভাত আনতে বললেন। সে বললো, ‘স্যার এখন তো ভাত পাওয়া যাবে না। তবে মগবাজারে খিচুড়ি পাওয়া যাবে।’

ডিসি তাকে দুই প্যাকেট খিচুড়ি আনতে বললেন। আমার ক্ষুধা থাকলেও একদম খাওয়ার ইচ্ছা হচ্ছিল না বলে বিনয়ের সাথে আমার খাবার আনতে না করলাম। খাবার এলো। ডিসি ডিনার করলেন। অনেকটা সময় ধরে আমার সঙ্গে নানান বিষয়ে গল্প করলেন। তিনি আগের রাতেও নাকি ঘুমান নাই। খুবই ক্লান্ত, কিন্তু আমাকে সঙ্গ দেয়ার জন্য ভোর রাত পর্যন্ত আমার পাশে ছিলেন। রাত তিনটার দিকে একটা চীনা বাদামের কৌটা ধরিয়ে দিলেন। তিনি কয়েকবার বলার পর কিছুটা বাদাম নিলাম। 

এই সময়ে আমি মনে করিয়ে দিলাম আমাকে ছাড়া হবে কখন? তিনি একবার বললেন, ‘মোবাইল ব্যবসায়ীদের একজনকে ধরতে পারলে আপনাকে ছেড়ে দিবো।’ কিছুক্ষণ পর স্মার্টফোন ও গ্যাজেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ পিয়াসকে ডিবি নিয়ে আসলো। আমি বললাম এবার আমাকে ছাড়ুন। তিনি বললেন, ‘সংগঠনের সভাপতি মো. আসলামকে পাওয়া যায়নি। উনি হলে আপনাকে ছাড়তে পারতাম।’

এর আধা ঘণ্টা পর তিনি আবার বললেন, ‘আপনাকে একটা মুচলেকায় স্বাক্ষর করিয়ে ছেড়ে দিবো। সেখানে লেখা থাকবে আপনাকে কোনো টর্চার করা হয়নি, ভুল বোঝাবুঝির কারণে আপনাকে নিয়ে আসা হয়েছিল।’

একজনকে ডেকে এই মুচলেকা লিখতে বললেন। আরো আধা ঘণ্টা পর মুচলেকা এলো। কিন্তু এবার ডিবির প্রধান ফোন ধরছেন না। ঘুমিয়ে গেছেন বলে এটা সম্ভব হচ্ছে না। এরপর তিনি আমাকে অন্য একজনের জিম্মায় দিয়ে ফজর আজানের পর বাড়ি গেলেন।

মেন্যু আইটেম ৩, কফি:

সারা রাত নানা নাটকীয়তা শেষে দিনের আলো ফুটে গেল। আশরাফুল নামের যে পুলিশ সদস্য আমাকে তুলে এনেছিলেন, তিনি বাসা থেকে ফ্রেশ হয়ে এখন ডিবি কার্যালয়ে আসলেন। ততক্ষণে অনেক গণমাধ্যমে আমাকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আশরাফুলের নামও এসেছে। তার মুখে অস্বস্তির ছাপ। তিনি বললেন, ‘আমি তো শুধু অর্ডার পালন করেছি, কিন্তু আমার নামও চলে এলো’, সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো।

‘কিছু খাবেন কিনা? কফি খাওয়াই?’ ক্লান্ত লাগছিল, তাই আমি আর না করলাম না। সে নিজের হাতে ধোঁয়া-ওঠা কফি বানিয়ে আনলো। সে ভালো কফি বানাতে পারে এটা স্বীকার করতেই হবে। 

এরপর দেখলাম আশরাফুলের কাছে একের-পর-এক কল আসছে তার ঊর্ধ্বতন থেকে। আমাকে দ্রুত ছাড়ার তাগিদ দিচ্ছে। তবে সেটা ফর্মালিটি মেনে মুচলেকা লিখে আমার স্বাক্ষর করে এরপর ছাড়তে হবে। এই মুচলেকা রেডি করতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগলো। একবার মুচলেকায় একটা লাইন যোগ করতে বলে তো আবার পরের কলে সেটা ফেলে দিতে বলে। এভাবে অনেক সময় নিয়ে মুচলেকা রেডি করলো। আমাকে আটকের সময় কোনো স্থানীয় থানাকে জানানো বা আইডি কার্ড প্রদর্শনের যে বিধান রয়েছে, তার কোনোটিই মানা হয়নি। কিন্তু আমাকে ছাড়ার সময় ফর্মালিটি মানতে দুটি মুচলেকায় (একটি আমার, অন্যটি জিম্মাদারের) বাধ্যতামূলক স্বাক্ষর করতে হয়েছে। 

এবার গাড়ি দরকার। কিন্তু গাড়ি চাওয়ার পরেও আশরাফুল ঠিক মতো সাপোর্ট পাচ্ছে না। দেরিও হয়ে যাচ্ছে। পরে সে ডিবি প্রধানকে ফোন করে বললে তাৎক্ষণিক বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা হয়। এরপর দ্রুত কালো গ্লাসের গাড়ি রেডি হলো। আমি যদিও এখান থেকে নিজে থেকেই বাড়ি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাইরে অনেক সাংবাদিক দাঁড়িয়েছিলেন বলে সেই রিস্ক তারা নিতে চায়নি। খুব তাড়াহুড়ো করে আমাকে গেট থেকে বের করা হয়। আমার বন্ধু তানভীর খন্দকার ও সাবেক সহকর্মী শুভ সারারাত গেটের বাইরে অপেক্ষা করছিল, তাদের সাথে নিয়ে বাসার দিকে রওনা হলাম।

সাড়ে ১০ ঘণ্টার এই রুদ্ধশ্বাস জার্নিতে আমার পেটে পড়েছিল শুধুই পানি, চীনা বাদাম আর এক কাপ কফি। বাকি গল্প না হয় আরেকদিন হবে। ডিবিতে ভাতের হোটেল বন্ধ হয়েছে কি না জানি না, তবে আমার কপালে জুটেছিল এটুকুই!

লেখক: মিজানুর রহমান সোহেল https://www.facebook.com/share/1AGVQikgYB/ (শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫)"

...

* ক্রমশ, শেখ হাসিনার ক্ষমতা পরির্বতনের পর কুশাসনের সমস্ত পর্বই ফিরে এসেছে! বাকী ছিল 'গুম-পর্ব'—কেবল এই একটা কারণে আমরা বড়ই আনন্দিত ছিলাম। কিন্তু তবলার ঠুকঠাক শুরু হয়ে গেছে, এবার গান গাওয়ার পালা! এটা হচ্ছে, গুমের প্রাথমিক পর্ব!

Monday, November 10, 2025

ডাক্তার নামের এক প্রতারক!

লেখক: ডা. মো: মারুফুর রহমান (লেখকের লিখিত অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

"এটি একজন সেলিব্রিটি ইনফ্লুয়েন্সার চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন। সবাই তাকে চেনেন, 'অর্গানিক জাহাঙ্গীর', 'কিটো জাহাঙ্গীর', 'জেকে', ইত্যাদি অনেক নামে। সেই চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের এই অবস্থা!

ন্যুনতম স্ট্যান্ডার্ডে প্রেসক্রিপশনে অবশ্যই সম্ভাব্য রোগের নাম, রোগীর সমস্যা, ভাইটাল সাইন, জেনারেল ফাইন্ডিং এগুলো থাকতে হয়। এই প্রেসক্রিপশন দেখে বোঝার উপায় নেই কি সমস্যায় এসব ওষুধ দেয়া হয়েছে। ফলে ওষুধগুলো আসলেই প্রয়োজনীয় কিনা তা যাচাই করার সুযোগ নেই।

তারচেয়ে বড় কথা এখানের ৭টি ওষুধের মাঝে ৭টিই নানা ধরনের ভিটামিন/ফুড সাপ্লিমেন্ট যা উপযুক্ত খাবারের মাধ্যমেই পুরণ করা সম্ভব। মুলত এই প্রেসক্রিপশনটি ফুড সাপ্লিমেন্ট-এর ব্যবসা বর্ধক ফর্মুলা ছাড়া কিছুই না এবং এ কারণেই ওষুধ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসারে চিকিৎসকদের ফুড সাপ্লিমেন্ট লেখা নিষেধ।

চলুন দেখি কি কি 'ওষুধ' লেখা হয়েছে।

১. প্রথমটি Cap Acteria, এটি একটি প্রোবায়োটিক। এতে মূলত কয়েক ধরণের উপকারী বাক্টেরিয়া থাকে যার অধিকাংশ ল্যাক্টোব্যাসিলাস গ্রুপের, যা প্রচুর পরিমাণে থাকে দইয়ে। এই ওষুধের প্রতি ক্যাপসুলে ৪ বিলিয়ন ব্যাটেরিয়া আছে।

যার প্রতিটার দাম ৪৫ টাকা, দিনে ২টা করে ৩ মাসে মোট খরচ ৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে ১ চামচ দইয়ে গড়ে ১-১০ বিলিয়ন বাক্টেরিয়া থাকে। এবার হিসাব করুন এ চামচ দই এর দাম কত?

উল্লেখ্য কোন নির্দিষ্ট রোগ সারাতে এর সরাসরি ব্যবহার উপযোগীতা নেই বরং স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস-এর অংশ হিসেবে নানাবিধ রোগের ঝুঁকি ও উপসর্গ কমাতে নিয়মিত এ ধরণের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া খাবারের সংগে গ্রহন করা বেশি উপকারী।

২. ২য় ওষুধ 'ভিটামিন ডি'। সূর্যের আলোর ভিটামিন অর্থাৎ আমাদের চামড়ায় সূর্য্যের আলো পড়লে এই ভিটামিন শরীরে তৈরি হয়। এছাড়াও নানাবিধ খাবারে ভিটামিন ডি থাকে যেমন তৈলাক্ত মাছ, ডিমের কুসুম, কলিজা ইত্যাদি।

তবে বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষেরই শরীরে ভিটামিন ডি কম। তাই এই সাপ্লিমেন্ট এর অনেকের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় হতে পারে যদি খাবার ও সূর্যের আলোর মাধ্যমে পুরণ না হয়। দাম হিসাব করলে প্রতি  ক্যাপসুল ৩৫ টাকা, সপ্তাহে ১টা করে ৬ সপ্তাহে ২১০ টাকা।

৩. ৩য় ওষুধ Santogen A-Z, মাল্টিভিটামিন, ১১টাকা পিস, দিনে ১টা করে ৬ মাসে, প্রায় ২০০০ টাকা। মানুষের কোন রোগের জন্যই মাল্টিভিটামিন খাওয়ার কথা চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোন বই বা গবেষণাপত্রে লেখা নেই। মানুষের শরীরে একই সাথে সব ভিটামিন এর অভাব কখনোই হয় না।

যেগুলোর অভাব নেই সেগুলো খেলে মল মুত্রের সাথে বেরিয়ে যায় (কিছু কিছু লিভারে জমা হয়)। ফলে এই ওষুধের বেশিরভাগ উপাদানই শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। কারও যদি কোন একটি দুটি ভিটামিন বা মিনারেলের অভাব থেকেও থাকে তারও উপকার হবে না কেননা এই মাল্টিভিটামিন এর বড়িতে সব ভিটামিন এত কম মাত্রায় যা অভাবজনিত প্রয়োজনীয় ডোজ এর তুলনায় অনেক কম।

৪. ৪র্থ ওষুধ, Carniten, এটি মানবদেহে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি এমাইনো এসিড এবং প্রায় সব ধরনের প্রাণিজ খাবারে এটি পাওয়া যায়। যাদের লিভার বা কিডনি মারাত্নক ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা খিচুনী রোগের কারণে বিশেষ ওষুধ খাচ্ছেন বা রেয়ার কিছু জেনেটিক রোগ ব্যতীত এই জিনিসের অভাব মানবদেহে হয় না।

কিডনি ড্যামেজ হওয়া ডায়ালাইসিস রোগীদের ক্ষেত্রে এটি সাধারনত ব্যবহার হতে দেখা যায়। প্রেসক্রিপশনটি যে রোগি বা যার নামে করা হয়েছে তার এ ধরনের রোগ আছে কিনা তা জানা যায়নি। কারণ রোগের বিবরন লেখা নেই প্রেসক্রিপশনে। আর যদি কিডনি বা লিভার ড্যামেজ থাকে তাহলে অন্য যেসব ডিব্বা খাওয়ানো হচ্ছে সেগুলো তার জন্য আরও ক্ষতিকর হবে। প্রতি পিস ৫ টাকা করে ৩মাসে এর পেছনে খরচ ৯০০ টাকা। 

৫. পরের ওষুধ Algecal Dx, ক্যালসিয়াম (600g)+ভিটামিন ডি। অর্থাৎ উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি ক্যাপসুল আলাদা করে দেয়ার পরেও এই ক্যালসিয়ামের সাথে ভিটামিন ডি আবারও দেয়া হচ্ছে। বড়ি প্রতি ১৬ টাকা করে ৬ মাসে খরচ ২৮৮০ টাকা। এই স্পেসিফিক ক্যালসিয়াম বড়ির বিশেষত্ব হলো এটি ক্যালসিয়াম কার্বোনেট যা সামুদ্রিক শেওলা থেকে বের করা।

ক্যালসিয়াম বড়ি কম খরচে ক্যালসিয়াম কার্বোনেট রূপে পাওয়া যায় ৫০০ গ্রাম ৫ টাকায়। ওষুধ কোম্পানি কিছুদিন পর-পর নতুন নতুন ক্যালসিয়াম বড়ি নিয়ে আসে শেওলার ক্যালসিয়াম, ঝিনুকের ক্যালসিয়াম ইত্যাদি ইত্যাদি। দাবী করে এগুলো সাধারন ক্যালসিয়াম এর চেয়ে বেশি শোষণ হয় শরীরে অথচ এর পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, যেটুকু আছে তাতে শোষনের পার্থক্য খুব বেশি নয়। সুতরাং ৫ টাকার স্থলে ১৬ টাকার বড়ির কোন মানে নেই। এছাড়ায় দুধ, ডিম, হাড়, গাঢ় সবুজ শাক, কলিজা, মাছ, মাংশ ইত্যাদিতেও ক্যালসিয়াম থাকে। বাংলাদেশের মানুষের শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব জনিত রোগের প্রকোপ বেশি, তাই এটি জরুরী। 

৬. ৬ নাম্বার ওষুধ, Ubi Q, এটি একটি এনজাইম CoQ10 এর একটি রূপ যা আমাদের শরীর নিজেই তৈরি করে। একবারে সুনির্দিষ্ট কিছু হৃদরোগ ছাড়া বাইরে থেকে এই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের পক্ষে কোন শক্ত ক্লিনিক্যাল এভিডেন্স নেই। ওষুধ কোম্পানি এটাকে 'দুর্বলতা কমানো, 'বয়স ধরে রাখা', 'ইমিউনিটি বুস্টার' ইত্যাসি চটকদার উপায়ে প্রমোট করে।

এসবের পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শরীর এটাকে নিজেই তৈরি করে। এই প্রেসক্রিপশনে ১০০ মিলিগ্রাম Ubi Q, ৪৫ টাকা পিস দরে, দিনে ২টা করে ৬ মাসে খরচ ১৬,২০০ টাকা! ওদিকে গরুর হার্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ১০ মিলিগ্রাম, মাংসে ৩-৪ মিলিগ্রাম, মুরগিতে ২-৩ মিলিগ্রাম, তৈলাক্ত মাছে ৪-৮ মিলিগ্রাম, ডিমের কুসুমে ১-২ মিলিগ্রাম এই এনজাইম থাকে। 

৭. ফাইনালি, ৭ নাম্বার হলো ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ১০০০ মিলিগ্রাম। মাছের তেল ও ভেষজ তেল (সরিষা, সয়াবিন, চিয়া সিড, বাদাম)-এ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ১০০ গ্রাম সরিষা তেলে ৫০০০ মিলিগ্রামের বেশি ওমেগা-৩ থাকে। ১০০ গ্রাম রুই মাছে ৬০০ মিগ্রা, ১০০ গ্রাম পাঙ্গাসে ১২০০ মিগ্রা ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। এই বড়িতে ১১ টাকা প্রতি পিসে ৩মাসে ৩৩০ টাকা খরচ।

এই সাপ্লিমেন্টও ওষুধ কোম্পানি ইমিউনিটি বুস্টার, বলকারক, প্রদাহ নিবারক, হৃদরোগ থেকে সুরক্ষা ইত্যাদি নানা দাবী করে বিক্রি করে। আপাত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এসব দাবীর পক্ষে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমান নেই। সুনির্দিষ্ট কিছু রোগ যেমন উচ্চ মাত্রার ট্রাউগ্লিসারাইড কমাতে এই সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের পক্ষে কিছু প্রমাণ আছে। 

সুতরাং সব মিলিয়ে এই প্রেসক্রিপশনে খরচ ৩০ হাজার টাকার বেশি! অথচ কি রোগ, কি বৃত্তান্ত কিছুই লেখা নেই। সব ক'টি ওষুধই ফুড সাপ্লিমেন্ট যা নিয়মিত খাবারের মাধ্যমেই অনেক অনেক কম খরচে গ্রহন করা সম্ভব আরও অনেক বেশি পুষ্টি উপাদান সহ। ওষুধ প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও পুরো প্রেসক্রিপশন ভরে শুধুমাত্র ফুড সাপ্লিমেন্ট লিখে যাচ্ছে এই লোক! একদিকে অন্যান্য চিকিৎসকদের নিয়মিত বিষোদগার করছে আবার নিজেই ৩০ হাজার টাকার সাপ্লিমেন্ট ধরিয়ে দিচ্ছে।

এই প্রতারণা নিয়ে অনেকে অনেকবার লিখেছেন কিন্তু তার সেলিব্রিটি স্ট্যাটাস তাকে ইমিউন করে রাখে আইনের হাত থেকে। সম্ভবত এই রোগীর কাছ থেকে তিনি কোন ভিজিট রাখেন নি, কোন টেস্ট দেননি, ৩০ হাজার টাকা ধোঁকাবাজি বড়ি বিক্রি করেছেন শুধু। তাতেই রোগি শতভাগ খুশি হয়ে এই প্রেসক্রিপশন শেয়ার করেছেন ফেসবুকে।

পাঠক, আপনাকে প্রতারণার হাত থেকে বাঁচাতে পারেন আপনি নিজেই। বাংলাদেশের কোন আইন আদালত এইসব সেলিব্রিটিদের কখনো স্পর্শ করে না। চটকদার প্রচারনায় বিভ্রান্ত না-হয়ে যাচাই করুন, প্রশ্ন করুন, উত্তর খুঁজুন উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ, বা গবেষণাপত্র অথবা সহজ উপায়ে চ্যাটজিপিটি থেকেও। শতভাগ না হলেও অন্তত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ ধরনের প্রতারণা ধরতে পারবেন ও সাবধান হতে পারবেন।"

লেখক: ডা. মো: মারুফুর রহমান

চিকিৎসক ও গবেষক 'দ্যা ইউনিভার্সিটি অফ শেফিল্ড', যুক্তরাজ্য। (সিনিয়র পারফর্মেন্স মিজারমেন্ট স্পেশালিস্ট, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, সাস্কাচুয়ান, কানাডা)

Tuesday, October 28, 2025

'এক ভচকানো চেহারার মুখোশ, শাহনেওয়াজ আলতাফ!

যেটায় কারও হাত নাই, যেমন কারও শারীরিক অসংগতি, সেটা নিয়ে আলোচনা করাটা বেজায় ছোটলোকগিরি— যার চালু নাম, বডি শেমিং!

এই যে লোকটা, এর নাম আলতাফ শাহনেওয়াজ। কাজ করতেন দৈনিক প্রথম আলোয় সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে। এবং সাহিত্যিক। আমার ধারণা, প্রথম আলোর চাপরাশিও কালে-কালে একজন সাহিত্যিক হয়ে যান! মুভি বলতে যেমন বোঝায় হলিউড, বিশ্বসাহিত্য বলতে যেমন ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য তেমনি এই দেশে সাহিত্যিক মানে 'প্রথম আলো ঘরাণার সাহিত্যিক'!

যাই হোক, পরে আলতাফ শাহনেওয়াজ যোগ দেন 'Dhaka Stream'-এ। তারই এক সহকর্মী স্বর্ণময়ী বিশ্বাস, আত্মহত্যা করেছেন এমনটাই বলা হচ্ছে এবং এর পেছনে আলতাফের পরোক্ষ হাত নেই এমনটা বলা যাবে না। নমুনা:

এই মৌসুমী হচ্ছেন, একজন সংবাদকর্মী এবং স্বর্ণময়ীর আত্মীয়। আমি বিশ্বাস করি, মৌসুমীর প্রত্যেকটা কথা সত্য কারণ এই আলতাফের বিরুদ্ধে কেবল স্বর্ণময়ীই না ২৬ জন গণমাধ্যমকর্মী লিখিত অভিযোগ করেছিলেন:


কিন্তু, দ্য গ্রেট চুতিয়া, ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, অভিযুক্ত ব্যক্তি আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেননি। নিয়ম অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্তকে অন্তত সাময়িক বরখাস্ত করার কথা।

আমি যেহেতু আলতাফের লেখা পূর্বে পড়ি নাই তাই তার লেখার মান নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত রইলাম। হতে পারে এই লোক বিরাট সাহিত্যক কিন্তু আমি বারবার যেটা বলি, একজন ভাল সাহিত্যিক, একজন ভাল চাকুরেজীবী হলেই সে ভাল মানুষ হবে এর কোন নিশ্চয়তা নেই!

আমি ব্যক্তিগত ভাবে কাউকে 'বডি শেমিং' করাটা অন্যায় মনে করি—অন্যকে এই অন্যায় করতে জোর নিষেধ করব। কিন্ত... কেউ-কেউ যেমন নিজেকে খুন করাটা ঠেকাতে পারেন না (যার চালু নাম আত্মহত্যা); তেমনি আমিও, আলতাফ শাহনেওয়াজের ভচকানো চেহারা, তার ভচকানো পা (এ খুড়িয়ে হাঁটে) এটা বলে এই অন্যায় না-করে পারছি না...।

Friday, October 17, 2025

নরক এবং একজন ব্যারিস্টার আরমান!

লেখক: Shubhajit Bhowmik (শুভজিৎ ভৌমিক) [https://www.facebook.com/share/1FxKc5AbJB/]

"(১) ব্যারিস্টার আরমানের গুম নিয়ে বানানো ডকুমেন্টারিটা, যে-কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে  সহ্য করতে পারার মতো না। অন্তত আমি পারি নাই!

এজন্য খুব একটা সংবেদনশীল মানুষ হওয়ার দরকার নাই। জাস্ট খুব সাধারণ 'মানুষ' হলেও, আরমানের গুমের বীভৎস এই বর্ণনা আপনাকে সহ্য করতে পারার ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে  নিয়ে যাবে।   

(২) হাসিনার গুম সিন্ডিকেটের, সম্ভবত সবচেয়ে নির্মম এবং নৃশংসতম অত্যাচারের ভিকটিম হচ্ছেন, ব্যারিস্টার আরমান। 

ওঁকে 'আট বছর' র‍্যাবের Task Force for Interrogation cell (TFI)- এই জায়গাতে গুম করে রাখা হয়েছিলো। 

সবচেয়ে নির্মম কেন বলছি এইটাকে? কারণ, গুমের শিকার অন্যান্য মানুষকে হয় মেরে ফেলা হয়েছে। নাহয় টর্চার করে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু, ব্যারিস্টার আরমানকে আট বছর, এমন একটা পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছিলো, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের মৃত্যু কামনা করে। বন্দী আরমান নিজে বহুবার অনুরোধ করেছেন, এতো যন্ত্রণা দেয়ার চেয়ে তাঁকে বরং মেরে ফেলতে।

আহারে-আহারে। একটা মানুষ কোন পর্যায়ে গেলে নিজের মৃত্যু কামনা করে! কিন্তু আরমানকে মেরেও ফেলা হয়নি!

(৩) আট বছর এই মানুষটার টয়লেটে যাওয়ার স্বাধীনতাও ছিলো না। দেয়ালে হ্যান্ডকাফ দিয়ে শব্দ করে টয়লেটে যাওয়ার আবেদন জানাতে হতো। বহুবার কেউ আসেনি তাঁকে টয়লেটে নিতে।

কাপড় নষ্ট হয়েছে। সেই ময়লা আবার তাঁকেই পরিষ্কার করতে দেয়া হয়েছে। বন্ধ রুমের গরমে, ঘাম প্রস্রাব ঝরে-ঝরে মেঝেতে পানি জমে যেতো। তাঁর মধ্যে ঘুমিয়েছেন আরমান।

হাতকড়া পরে থাকতে থাকতে-থাকতে আরমানের কবজিতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল। তখন সেই হাতকড়া খুলে তাঁর পায়ে পরিয়ে দেয়া হয়েছে। কোরবানির গরুকেও এই নৃশংস যন্ত্রণা দেয় না মানুষ। 

(৪) জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। ৩২ বছর বয়সী ৩২ বছর বয়সের যুবক আরমানকে বাসা থেকে গুম করা হয়। যখন ফিরলেন, তখন তাঁর বয়স চল্লিশ। চোখে দেখেন না। হাঁটতে পারেন না। ভয় পায়, অহেতুক!

ছোট-ছোট দুইটা মেয়ে সন্তান। বাবাকে যখন ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো খালি পায়ে, ছোট মেয়েটা বাবার দুইটা জুতা হাতে তুলে পেছনে-পেছনে যাচ্ছিলো, 'বাবা তোমার জুতা'। 

সহ্য করার মতো নারে, ভাই।

(৫) মেয়েগুলো এখন বড় হয়ে গেছে। বাবা বেঁচেই ছিলেন, কিন্তু নিজের চোখে বাচ্চাগুলোর বড় হওয়ার দৃশ্য দেখতে পারেননি। 

বাচ্চাদের সাথে বাবার ইমোশনাল বন্ডিং তৈরি হওয়ার সময়টাতেই বাবা ছিলেন না। বাচ্চাদের টেক-কেয়ার করার জন্য বাবার মায়াময় চোখ ছিলো না। 

আরমানের স্ত্রী জানতেন না, তাঁর স্বামী বেঁচে আছে, নাকি নাই। তিনি সধবা নাকি বিধবা। এ কোন আঁধার, রাতের চেয়েও অন্ধকার...!

আহারে আমার ভাই। আহারে।

(৬) অন্ধকারে চোখ বাঁধা থাকতে-থাকতে, আরমানের চোখে ছানি পড়ে গেছে। সবকিছু ঝাপসা দেখেন। 

লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে আসা মানুষটার উজ্জ্বল ক্যারিয়ার সম্পূর্ণ শেষ। ফ্যামিলিটাও ফাইন্যান্সিয়ালি ধ্বংস হয়ে গেছে।

অপুষ্টিতে ভুগে স্বাস্থ্যবান লোকটা শুকিয়ে জীর্ণ হয়ে গেছেন। লোকটার সংগে কথা বলার কেউ ছিলো না! এক পর্যায়ে তিনি রুমের টিকটিকির সাথে, পিঁপড়ার সাথে কথা বলা শুরু করেন। 

টিকটিকির নাম ছিলো 'টুকটুকি'। তিনি বড় আবেগ নিউএ বলতেন, 'এই টুকটুকি, তোর কয়টা বাচ্চা? আমার না দুইটা মেয়ে আছে, ছোট...'!

(৭) দাঁতে দাঁত চেপে ব্যারিস্টার আরমানের গুমের এই ডকুমেন্টারি দেখেন। ১৫০০+ মানুষের ওপর এই মধ্যযুগীয় নির্যাতন চালিয়েছিল হাসিনা আর তার লোকজন। 

ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকে এই গুমের কাহিনী লেখা হোক। এই জাতিকে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে আওয়ামী রেজিমের জুলুমের ইতিহাস। আয়নাঘরগুলোকে মিউজিয়াম বানিয়ে, সেখানে বাচ্চাদের শিক্ষা সফরে নিয়ে আসা হোক। 

আমরা যেন ভুলে না যাই, আওয়ামী জাহেলিয়াত কী জিনিস ছিলো। আমরা যেন মনে রাখি। 

(৭) ডকুমেন্টারির সবচেয়ে ভয়াবহ ক্লিপ হচ্ছে, আরমানের মুক্তি পাওয়ার দৃশ্যটা। 

আট বছর পর অচেনা রাস্তায় যেন একটা পশুকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সে জানে না এটা কোন জায়গা! কতো সাল? সে জানে না, সে কতো বছর বন্দী ছিলো! সে জানে না, হাসিনা পালিয়ে গেছে! সে রাস্তাঘাট কিচ্ছু চিনতে পারছে না।

সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে লুঙ্গি পরা একটা জীর্ণকায় লোক। দুই পায়ে টলতে-টলতে ইবনে সিনা হাসপাতালে ঢুকছে। আট বছর পরে কেউ তাঁকে চিনতে পারছে না।  ময়লা কাপড়ের জন্য কেউ তাকে বিশ্বাস করছে না।

(৮) মানুষটা ভয়ে গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে রেখেছে। যদি তাকে চিনতে পেরে আবারও কেউ ধরে নিয়ে যায়। পরাধীন থাকতে-থাকতে, মানুষটা ভুলেই গেছে যে, স্বাধীনতা এসে গেছে। 'হি ইজ ফ্রি...'।

আহারে, মানুষটা! বাকী জীবন কীভাবে কাটাবে এই ট্রমা নিয়ে?

একজনের কাছ থেকে একটা মোবাইল ধার করে আরমান নিজের নাম লিখে গুগল করেন। গুগলে তার পুরাতন চেহারার ছবি বের হয়ে আসে। নিজের চেহারার পাশে সেই মোবাইলের ছবি ধরে ইবনে সিনার কর্মকর্তাদের তিনি বলেন, 'দেখেন তো, এইবার চেনা যায়?

(৯) ওই প্রথমবার, আট বছর পর মুক্ত হয়, স্বাধীন হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসে (সম্ভবত) সর্বোচ্চ নির্যাতনের শিকার, মীর আহমাদ বিন কাশেম, আরমান। আমাদের ভাই। 

কী অসম্ভব প্রাণশক্তি থাকলে, লোকটা এখনও মানসিকভাবে সুস্থ আছেন, পাগল হয়ে যাননি, ভাবতে অবাক লাগে। নিঃস্ব হয়ে গেছেন মানুষটা। এই ডকুমেন্টারি হচ্ছে আরমানের সেই জীবনের গল্প, যে জীবনের চেয়ে মৃত্যুই হয়তো ভালো ছিলো। 

(১০) আপনারা দয়া করে ডকুমেন্টারিটা দেখেন। বোঝেন। উপলব্ধি করেন। আরমানের সাথে আরমানের আটটা বছর, বিশ মিনিটে কাটিয়ে আসেন। 

এই মহাপাপ, এই মহা অন্যায়ের বিচার দাবি করেন। চোখের জলে বুক ভাসান, যেভাবে আরমান ভাসিয়েছিলেন তাঁর শুয়ে থাকার মেঝেটা। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র যাতে আরমান সহ গুমের প্রত্যেক ভিকটিমের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়, সেই দাবিটা করেন রাষ্ট্রের কাছে। 

(১১) আমাদের দুর্ভাগ্য, এতো সবকিছুর পরেও কিছু অমানুষের বাচ্চা, আওয়ামী দলদাস মাদার... গুমের জলজ্যান্ত প্রমাণকে নাটক হিসাবে দাবি করে। দেড় হাজার মানুষের লাশ অস্বীকার করে। 

মানুষ হিসাবে আপনার নিজের ওপর ঘেন্না জন্মাবে, যে এইসব অমানুষের সাথে আপনাকে একই বাতাসে অক্সিজেন শেয়ার করতে হয়। একই মাটির স্পর্শ শেয়ার করতে হয়। একই সূর্যের আলো শেয়ার করতে হয়।

এইসব অমানুষের জাত, দলবাজ শুয়ারের বাচ্চার সাথে আপনাকে পাশাপাশি বেঁচে থাকতে হয়! আফসোস, আমাদের কিছুই করার নাই।  

(১২) জ্জা যদি এইটা না হয়, তাহলে লজ্জা কী কেবল দিগম্বর থাকা? 

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম স্বৈরাচার, শেখ হাসিনা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্যতম পিশাচের নাম, শেখ হাসিনা। 

আর কেউ না জানুক, আরমান জানে। ভাই আমার, আপনার বাকী জীবনটা সহজ হোক। সুন্দর হোক। দুনিয়াতে এখনও সবাই দলবাজ, লীগ হয়ে যায়নি।

দুনিয়াতে এখনও কিছু 'মানুষ' আছে। যারা আপনার অন্য ভুবনের বেদনা ধারণ করার চেষ্টা করে...।"

-লেখক: Shubhajit Bhowmik (শুভজিৎ ভৌমিক) [https://www.facebook.com/share/1FxKc5AbJB/]


Monday, October 13, 2025

কারাগারময় বাংলাদেশ!

সামরিক বাহিনীর যাদের প্রতি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এদের জন্য আলাদা জেলখানা স্থাপন করা হয়েছে। এ এক বিস্ময়!

এ সত্য, সরকার আইন কপচিয়ে এটা করেছে:

এখানে Prisions act 1894-এর ৩(বি) ধারার প্রয়োগ করা হয়েছে। ভাবা যায়, আমাদের দেশে এখনও ১৩১ বছর, প্রায় ১৫০ বছর পুরনো আইনে দেশ চলে! একটা স্বাধীন দেশে এখনও ব্রিটিশদের আইনের বাইরে আমরা যেতে পারিনি! ব্রিটিশদের দেখলে এখনও যে আমরা প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলি না আমাদের এও এক বিরাট সাহস! আমাদের বাপ-দাদাদের পিঠে পা রেখে সাহেবরা ঘোড়ায় উঠত আর এখনও সাহেবদের আইন আমাদের মাথায়-মগজে! 

যাই হোক, এই আইনে যেটা বলা হচ্ছে:


"(b) Any place specially appointed by the Government under section 541..."

এবং ঝড়ের গতিতে রাষ্টপতি  আদেশ দিয়েছেন!
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সামরিক-বেসামরিক মিলিয়ে ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ক্যান্টনমেন্ট-এর ভেতর একটি স্থাপনাকে কারাগার ঘোষণা করা হয়েছে!
যে মামলা নিয়ে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা সেটা কিন্তু সাধারণ কোন মামলা না, ৩টির মধ্যে ২টিই গুম সংক্রান্ত। সোজা ভাষায় বললে, খুনের মামলা—ভয়ংকর এক মানবতা বিরোধি অপরাধ! গুম নিয়ে যারা হাসাহাসি করেন, হালকা চালে দেখেন তারা গুম কমিশনের এই ডক্যুমেন্টারিটা দেখে নিলে ভাল করবেন। এরপরও কারো যদি হাসি আসে তাহলে সে একটা 'বাই বোর্ন শুয়োর'!

আমার স্বল্প জ্ঞানে যেটা বুঝি, যে সামরিক লোকজনের জন্য আলাদা কারাগার করা হলো তাদের বিচার কি সামরিক আইনে হচ্ছে? না!
আমরা চিফ প্রসিকিউটরের বক্তব্য একটু শুনি:
যেহেতু এখানে কোর্ট-মার্শাল চলছে না—সরল প্রশ্ন, এই সামরিক লোকজনদেরকে কি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে? জাজ কি বলেছেন যে জামিন হবে, কি হবে না? জাজ কি বলেছেন, এরা কারাগারে যাবেন, কি যাবেন না? জাজ কি বলেছেন, কারাগার কি এদেশে হবে, নাকি অন্য দেশে? নাকি জাজ নিজেই ক্যান্টনমেন্টে চলে যাবেন বিচারপর্ব পরিচালনা করার জন্য?
আর্মি আইনে অবশ্য বলা আছে:
"... If the accused is in custody, then the investigation must be started within 48 hours from the time of his arrest excluding public holidays..." -(Army Act, Section 74)
এখানে যেহেতু আর্মির এই আইন অচল তাই চিফ প্রসিকিউটর প্রচলিত আইন থেকে যেটা বলছেন, ২৪ ঘন্টার মধ্যে আদালতে উপস্থাপন করতে হবে এটাই সঠিক। এর ব্যতয় হওয়ার তো কোন সুযোগ নাই। 
এখন সামরিক লোকজনদের জন্য যদি আলাদা কারাগার বানাবার প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে সাবেক বিচারপতি, সাবেক সিইসি এদের জন্যও তো আলাদা কারাগারের আবশ্যকতা দেখা দেবে। তখন বিচারপতিদের জন্য হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে একটা কারাগার, মন্ত্রীদের জন্য মিন্টু রোডে একটা কারাগার আর 'কানকাটা রমজানের' জন্য কাশিমপুর কারাগার...।

কারাগারময় বাংলাদেশ! 

মোগলরা এখন জুস বিক্রি করে!

শায়েস্তা খান আমলের (১৬৭১) এই  ছোট কাটারা দেখতে গিয়ে মনটাই খারাপ হয়ে গেল!