Search

Wednesday, March 26, 2025

পতাকা ছিনতাই!

কপালের ফের! যাপিত জীবন পেছনে ফেলে মাস ছয়েক হলো ইট পাথর-কংক্রিটের বস্তিতে, যার চালু নাম 'ঢাকা শহর'! তাও নিজের বাড়ি ফেলে এখন ভাড়া বাড়িতে!

ঢাকা, এ বড় বিচিত্র এক নগর! এর বিচিত্রতা নিয়ে অন্য কোন এক দিন আলাপ করা যাবে!

আজ ২৬ শে মার্চ, আমাদের স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতা কেমন এ নিয়ে তাবড়-তাবড় মানুষদের বড়-বড় আলাপ আছে। আমার আলাপ খুব ছোট। স্বাধীনতা কি এটা আপনাকে জানতে হবে একজন প্যালেস্টাইন নাগরিকের কাছ থেকে। নিদেনপক্ষে আমার কাছ থেকে যে নিজের বাড়ি এবং ভাড়া বাড়ির মধ্যে তফাতটা কেমন! 

আজ ছাদ থেকে চারদিকের চারটা ছবি তুললাম।




কোথাও একটা পতাকা নেই! কী ভয়ংকর এক ছিনতাই! কী নির্মম রসিকতা! আমাদের স্বাধীনতা দিবসে পতাকায় পতাকায় সমস্ত শহর-গ্রাম ছেয়ে যাবে না এ কী করে হয়! এই আবেগটাই তো আমরা দেখে-দেখে বড় হয়েছি কিন্তু আজ এই পড়ন্ত বেলায় এসে এ কী দেখছি! এ যেন অনেকটা এমন, আমাদের শরীর থেকে চকচকে চামড়াটা সরিয়ে নিলে  কুৎসিত সব যেমন উম্মুক্ত হয়ে পড়ে ঠিক তেমনই!

এর জন্য বর্তমান সরকারকে আমি অনেকখানি দায়ী করি। অনেকে বলবেন, সরকার তো পতাকা উড়াতে নিষেধ করেননি! তা করেনি কিন্তু...

সরকার আমাদেরকে কোনটা সহি আর কোনটা জাল এটা একটা ঘোরের মধ্যে রাখছে। অনেকে বুঝতেই পারছে না জয় বাংলা বললে গর্দান যাবে নাকি 'জিয়া বাংলা' বললে ফুলের তোড়া!

এখন আসলে 'দা থেকে আছাড়' বড় হয়ে যাচ্ছে! অনেকে ৭১ আর ২৪ গুলিয়ে ফেলছেন! ডিম আগে না মুরগি এই নিয়ে তর্ক করা চলে কিন্তু বাপ আগে না সন্তান এই নিয়ে কুতর্ক অহেতুক!

মসজিদের মত কবে থেকে শহীদ মিনারে তালা মেরে রাখা শুরু হল?

প্রায় দেড় যুগ আওয়ামিলীগ শাসন (অপ) করেছে। এই সুদীর্ঘ সময়ে হেন অপকর্ম- অনাচার-অত্যাচার নাই যেটা করেনি!

শেখ হাসিনা এবং তার দল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যতবার বিক্রি করেছে এত টেসলাও সম্ভবত বিক্রি হয়নি!

আর এই টাইপের 'চুতিয়া বুদ্ধিজীবী' মানুষগুলো আমাদের জয় বাংলাকে একেবারে 'জয় বাংলা' করে দিয়েছে, টুট... টুট!

কিন্তু তাই বলে কী আ, লীগ মুক্তিযুদ্ধ, জয় বাংলা, স্বাধীনতা, পতাকা বলল বলে আমরা সব ত্যাগ করব! পতাকাও...? আচ্ছা, এখন আমরা কী আলীগের সময়ে  যত গাছ জন্মেছে সব কী আমরা কেটে ফেলব?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছোট একটা ফ্রেমে আটকাবার বিষয় না, বিশাল এক ক্যানভাসের কাজ! একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো গানের পাখি সাদি মহাম্মদ  [] ১৯৭১ সালে হারিয়েছেন ২৫ জন স্বজন! আপনি ভাবতে পারেন তাঁর চোখের সামনে জবাই করেছে তাঁর প্রিয়জনকে!

মশিহুর রহমানকে [] পাকিস্তানি আর্মি একেক করে কেটে ফেলেছিল হাত, পা কিন্তু তিনি নতি স্বীকার করেননি!

সুরুজ মিয়া [] যে মানুষটা জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করেছিলেন তিনি পেটের ক্ষিধায় নিজেকে মেরে ফেলেছিলেন। ৮ ঘন্টা তাঁর লাশ ঝুলছিল, নামাতে দেওয়া হয়নি!

উক্য চিং [], এই মানুষটাকে নিয়ে আস্ত একটা মুভি  বানানো চলে! আমাদের নারীদেরকে চরম অমর্যাদা করার কারণে ৭জন পাক-আর্মির পুরুষাংগ কেটে রাস্তায় ফেলে রেখেছিলেন!

ভাগিরথী, প্রিনছা খেঁ [৫, ৬]: যে নারীদের শরীরটা ছিল ভয়ংকর এক অস্ত্র!

দুলা মিয়া []: যার যুদ্ধ সিনামাকেও হার মানায়। 

নৌ-কমান্ডো ফজলুল হক [৯]: যিনি বুকে লিমপেড মাইন বেধে উড়িয়ে দিয়েছেন বড়-বড় পাকিস্তানি জাহাজ!

এম, এ জব্বার [১২]: ভাবা যায়, এই মানুষটা পাকিস্তান থেকে আস্ত একটা ট্যাংক নিয়ে চলে এসেছিলেন!

ফাদার মারিনো রিগান [১৩]: ১৯৭১ সালে ভিন্ন ধর্মের এই মানুষটার কারণে শত-শত মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছিল!

হাজারি লাল তরফদার [১৫]: আমরা কয়জন  জানি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে একজন শুয়োর চড়ানো বীর প্রতীক আছেন? কেবল খেতাবের জন্য না, এই মানুষটার ভয়ে কুঁকড়ে থাকত পাক-আর্মি!

সহায়ক সূত্র:

১. সাদী মহাম্মদ: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html
২. মশিহুর রহমান: http://www.ali-mahmed.com/2009/10/blog-post_06.html
৩. সুরুয মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_28.html
৪. উক্য চিং: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8752.html
৫. ভাগিরথী: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_6057.html
৬. প্রিনছা খেঁ: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_27.html
৭. রীনা: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_7644.html
৮. দুলা মিয়া: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_08.html
৯. মুক্তিযুদ্ধে, একজন ঠেলাওয়ালা: http://www.ali-mahmed.com/2009/04/blog-post_18.html 
১০. মুক্তিযুদ্ধে  সুইপার: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_8807.html
১১. নাইব উদ্দিন আহমেদ: http://www.ali-mahmed.com/2007/06/blog-post_2292.html
১২.  একজন ট্যাংকমানব: https://www.ali-mahmed.com/2010/03/blog-post_03.html  
১৩. ফাদার মারিনো রিগন: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post_7597.html
১৫. শুয়োর চড়ানো একজন...:  https://www.ali-mahmed.com/2013/07/blog-post_1.html?m=1
১৪. লালু: http://www.ali-mahmed.com/2009/01/blog-post.html 

Thursday, March 20, 2025

বিচারপতি সাহাবুদ্দিন: এ দেশে এক অভূতপূর্ব, বিরল...!

লেখক: Shariful Hasan: (https://www.facebook.com/share/1BPXYjYD18/)

"অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ পেলেও কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান বা প্রয়োজন ছাড়া তিনি রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবনে আসেননি! রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত কোনো কিছু তিনি গ্রহণ করেননি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে বিদেশি অতিথিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপহার তিনি সরকারি তোষাখানায় জমা দিয়েছেন। সাধারণ পোশাক-পরিচ্ছদই তাঁর সবসময় পছন্দ ছিল। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর অনেকেই তাঁকে নতুন কিছু জামাকাপড় বা স্যুট তৈরির কথা বলেছিলেন। সেসব কথাকে তিনি আমল দেননি।

বলছি, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কথা। অতীতে বা পরে নানা বিষয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের স্ত্রী, পারিবারিক সদস্য বা আত্মীয়স্বজনের যে দোর্দণ্ড প্রভাব ও হস্তক্ষেপ দেখা গেছে, সেখানে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের ক্ষেত্রে এর এক কণা দেখা দূরের কথা, এ রকম কোনো কিছু শোনাও যায়নি। তাঁর স্ত্রী একবারের জন্যও বঙ্গভবনে আসেননি। রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা যায়নি। 


বিচারপতি সাহাবুদ্দীন থেকেছেন নিভৃতে, পরিবারের মধ্যে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সন্তান-সন্তানাদির অন্য রকম কোনো কথা শোনা যায়নি। কারও জন্য ছিল না কোনো বিশেষ সুবিধা। তাঁর বাসভবনে কোনো আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সবসময় রাষ্ট্রীয় অর্থ বাঁচাতেন তিনি। নিয়ম থাকলেও নিজের পরিবারের প্রতিদিনকার বাজারের খরচ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নিতেন না সাহাবুদ্দীন আহমদ। এর বদলে নিজের পকেটের টাকা দিতেন। 

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বিদেশে থাকা ছেলের সঙ্গে টেলিফোনে  কথোপকথনের সতেরশ টাকার বিল রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে নয় বরং নিজে দিয়েছেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তৃতা বা অনুষ্ঠানের একটি ভিডিও ক্যাসেট করিয়ে তার খরচ দিতে না পারলেও (এমন কোনো নিয়ম নেই বলে) একটি নতুন ভিডিও ক্যাসেট দিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষকে।

বিচারপতিদের সাধারণত বেশ কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় সমাজ থেকে। কিন্তু বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তার চেয়েও বেশি সতর্ক ছিলেন। এসবই তিনি করেছেন রাষ্ট্রীয় নেতাদের জীবনযাপনের একটি নির্দিষ্ট মান তৈরির জন্য এবং সেখানেও তিনি সফল হয়েছেন। 

সময়ানুবর্তিতার ব্যাপারে তাঁর  তীক্ষ্ণ নজর ছিল। প্রতিদিন সকালে দৈনিক পত্রিকা পড়ার মধ্য দিয়ে দিনের কাজ শুরু হয় তাঁর। ঠিক সময়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছেন প্রতিদিন, ব্যতিক্রমহীনভাবে। কখনো কোনো ফাইল তাঁর টেবিলে পড়ে থাকেনি। অবসর সময়ে তাঁর নেশা ছিল বই পড়া। 

গত কয়েকবছর ধরে আজকের এই দিনে প্রয়াত হবার পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে নিয়ে কথাগুলো লিখেছিলাম। এই দেশে সুযোগ পেলেই পদে বসা লোকজন যেভাবে ক্ষমতার বাহাদুরি করে সেই বিবেচনায় তরুণ প্রজন্মসহ সবার জন্য আজ কথাগুলো আরেকবার লিখতে ইচ্ছে হলো।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সরকারি অর্থ খরচে যে মিতব্যয়িতা অবলম্বন করতেন সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান নিজের স্মৃতি কথায় তা লিখেছেন। তখন বিচারপতি লতিফুর রহমান মাত্রই আপীল বিভাগের বিচারপতি হয়েছেন। তাঁর মেয়ে রূম্পা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেড়াতে এসেছেন। তিনি বললেন পর্দার কাপড় তিনি পছন্দ করবেন। তাঁর মেয়ে যে পর্দার কাপড় পছন্দ করল তার প্রতিগজ মূল্য ১১০ টাকা। তিনি তৎকালীন রেজিস্ট্রারকে ডেকে বললেন, আমার মেয়ে ১১০ টাকা গজের কাপড় পছন্দ করেছে এবং ওই ঘরের পর্দার জন্য দশ হাজার টাকার উপরে লাগবে। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার বললেন, এটা কোন ব্যাপার না।
 
পর্দা সময়মত এসে গেল এবং লাগানো হলো। অনেকদিন পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বিচারপতি লতিফুর রহমানকে ডেকে বললেন, আপনার এক ঘরের পর্দার দাম এসেছে দশ হাজার টাকার ওপরে। অথচ প্রধান বিচারপতির বাসায় চল্লিশ টাকা গজের পর্দা লাগানো হয়। 
বিচারপতি লতিফুর রহমান বললেন, তিনি সৌখিন লোক। তাছাড়া মেয়ে এটা পছন্দ করেছে। তিনি জানতে চাইলেন এখন তাকে কী করতে হবে। তখন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বললেন, আপনি সাড়ে চার হাজার টাকা দিয়ে দিন। বাকিটা সরকার দেবে। 
ওইভাবে নোট লেখা হলো। বিচারপতি লতিফুর রহমান টাকা দিয়ে দিলেন। টাকা দেয়ার পর প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।

ভাবতেই ভালো লাগে, এই দেশে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদের মতো অসাধারণ মানুষও ছিলেন!
আপনারা হয়তো জানেন, কখনও রাজনীতি না-করেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে মানুষটির ভূমিকা অনন্য। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ছিলেন। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

এরশাদের পতনের পর রাষ্ট্রপতির শূন্য পদে বসবেন কে; আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানই বা কে হবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলো। এই চরম বিভ্রান্তির মুহূর্তে কে হবেন রাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী প্রধান? কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদে? যিনি দায়িত্ব নেবেন তাকে যেমন হতে হবে নিরপেক্ষ তেমনি সবার কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। 

বাম জোটের পক্ষ থেকে হঠাৎ প্রস্তাব দেওয়া হলো সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নাম। মুহূর্তেই সবাই সেটা মানলেন। কারণ  বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের প্রতি সবার আস্থা ছিল। কিন্তু যখন সাহাবুদ্দীন আহমদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলো, তিনি অস্বীকৃতি জানালেন। 
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তখন টেলিফোন করে সাহাবুদ্দীন আহমদকে বললে:
'আপনি ছাড়া এই মুহূর্তে জাতিকে সংকট থেকে বের করতে পারে এমন কেউ নেই। আমরা আশা করি আপনি জাতিকে এই সংকট থেকে উত্তরণ করবেন।'
তিনটি রাজনৈতিক জোটের পীড়াপীড়িতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি প্রস্তাব গ্রহণ করবেন বলে জানালেন। তিনি তখন একটি শর্ত জুড়ে দিলেন। বললেন, 'যে দলই নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করুক, সরকার গঠনের পর যদি আমাকে দায়িত্ব পালন শেষে স্বপদে অর্থাৎ প্রধান বিচারপতির পদে ফিরিয়ে আনা হয় তবেই আমি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির পদ নিতে রাজি।'

রাজনৈতিক জোটগুলো তার প্রস্তাব মেনে নিল। এই দেশে সবাই ক্ষমতার সবচেয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে চান। আর সাহাবুদ্দিন আহমদ ফিরতে চাইলেন প্রধান বিচারপতি পদে। এজন্য অবশ্য সংবিধান পরিবর্তন করতে হয়। প্রথমবার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হলেও পরে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে। এবারও তাকে রাজি করাতে বেগ পেতে হয় আওয়ামী লীগকে। 

২০০১ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন। যদিও এবার নানা বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাথে মতবিরোধ তৈরি হয়। ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য লতিফুর রহমান ও তাঁকে দোষারোপ করা হয়। তবে অসাধারণ এই মানুষটি সকল মোহের ঊর্ধ্বে নিভৃতে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শুরুর প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন। শ্রদ্ধা মানুষটাকে। 

সরকারি একজন কর্মকর্তা সারোয়ার আলম বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও তাঁর দুই কন্যাকে নিয়ে লিখেছেন, অন্তর্মুখি এই বিশাল ব্যক্তিত্ব, মহান পুরুষ সম্পর্কে সম্ভবত বর্তমান প্রজন্ম অজ্ঞাত আর আমরা তখনকার প্রজন্ম বিস্মৃত। 
সারোয়ার আলম লিখেছেন, সম্ভবত ১৯৯৭/৯৮ সাল। তদানীন্তন মহামান্য রাষ্ট্রপতির দুই কন্যা সেতারা পারভীন ও সামিয়া পারভীন হুমায়রা আসবেন কলকাতায়। তখন আমি ডেপুটি হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব। প্রটোকলের সার্বিক গুরুত্ব ও সংবেদনশীল দায়িত্ব পড়লো আমার কাঁধে। উনারা কলকাতায় পৌঁছালেন। কিন্তু সমস্যা হলো কলকাতা বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে যেয়ে। 
এঁরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির মেয়ে, নিয়ম মতো পূর্ণ প্রটোকল পাবেন। কিন্তু উনারা দূতাবাসের সরকারি গাড়িতে কিছুতেই চড়বেন না । পরে নিরাপত্তার কথা আর খরচ তাঁরাই বহন করবেন- এই প্রতিশ্রুতিতে মিশনের গাড়িতে সফরে রাজি করানো হলো। উপদূতাবাস আগে থেকে নিউমার্কেটের কাছে রাজ্য সরকারের অতিথিশালা উনাদের থাকার বন্দোবস্ত করে রেখেছিল।
আমি অজস্র প্রটোকলে ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু এই অতিথিশালায় এবারই প্রথম। বিমানবন্দর থেকে উনাদের নিয়ে এসে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এই অতিথিশালা খুবই সাদামাটা আর অগোছালো, কিন্তু উনারা দু জনেই তা সাদরে গ্রহণ করলেন। 

আপনারা অনেকেই হয়তো জানেন, সিতারা পারভীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। বাবার মতোই ভীষণ বিনয়ী মানুষ। তিনি যে রাষ্ট্রপতির মেয়ে ছিলেন কখনোই বোঝা যেত না। 
২০০৫ সালের ২৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রে সড়ক দুর্ঘটনায় সিতারা পারভীন নিহত হন। আমি তখন বিডিনিউজে কাজ করি। দিনটি ছিল ভীষণ বিষাদের। সিতারার পারভীনের স্বামী আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলীও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এবং আরেকজন বিনয়ী ও অসাধারণ মানুষ। 

যাই হোক সারোয়ার আলমের স্মৃতিচারণে ফিরি। তিনি লিখেছেন, একদিন শ্রদ্ধেয় সেতারা আপা জানালেন বাবা (মহামান্য রাষ্ট্রপতি) রাতে প্রায় সাধারণ লুঙ্গি পরে লনে নেমে আসেন, অফিসারদের কাছে চলে যান। উনি তাই রাতের ঘুমানোর পোশাক পায়জামা ও কোর্তা বাবাকে উপহার দেওয়ার উদ্দেশ্যে কিনতে চান। কারণ বাবা নিজে তা কিনবেন না। একদিন উনাদের কলকাতার এসি মার্কেটসহ সেসময়ের বড় শপিং মলে নিয়ে গেলাম। কিন্তু বাঁধ সাধলো দাম। 

বেশি  দাম দিয়ে কিনলে আর আড়ম্বরপূর্ণ হলে যে পিতা সাহাবুদ্দীন আহমদ তা গ্রহণ করবেন না! পরে অনেক খুঁজে-টুজে গড়িয়াহাটের সাধারণ মার্কেট থেকে কেনা হলো, তদানীন্তন মাননীয় রাষ্ট্রপতির জন্য, সস্তায় ও অতি সাধারণ মানের নাইটি বা রাতের পোশাক। পিতার মতোই সন্তানেরাও নম্র, ভদ্র; চিন্তা, চেতনা ও কর্মে সৎ এবং পূর্ণ আদর্শবান। এমন সাটামাটা জীবনযাপন ও আদর্শবান মানুষ ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণীয় শুধু নয় পুরোটা অনুসরণীয়। 

আমরা ভারতের রাষ্ট্রপতি এপিজে কালামকে নিয়ে এমন অনেক ঘটনা জানি। অথচ বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে নিয়ে এগুলো সেভাবে প্রচার হয়নি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দেশে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং গণতন্ত্রের সঠিক উত্তরণ;  বিচার, সংবিধান ও শাসন পরিচালনায় সততা, শুদ্ধতার বিরল সব দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। 

আজ কথাগুলো আবার লেখার কারণ, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ২০২২ সালের আজকের দিনে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজ তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীত তাকে শ্রদ্ধা। দোয়া করি আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন। আমাদের সৌভাগ্য এই দেশে এমন মানুষ ছিলেন। কাজেই সেই গল্পগুলো ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি যাতে চারপাশে খারাপের ভীড়ে আমরা সততার চর্চা হারিয়ে না-ফেলি! বিশেষত এই দেশের নানা পদে থাকা ক্ষমতাসীন মানুষগুলোর কাছে অনুরোধ, বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে অনুসরণ করতে পারেন। কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট কী জিনিস তা বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে দেখে শিখতে পারেন।"- লেখক: Shariful Hasan
 
* ছবি ঋণ: Apu Nazrul