সংসদে হান্নান মাসউদের এঁদেরকে দেখে আনন্দিত হওয়ার কথা কিন্তু তিনি যে তর্জনী দিয়ে এদের শাসাচ্ছেন মনে হচ্ছে এ এক অশ্লীল তর্জনী!
তা হান্নান মাসউদ কেন ক্ষেপে গেলেন?
"ন্যানো ড্রাইভটা ফেলেছি হারিয়ে/ যেটায়—রাখা ছিল ৮০০ কোটি/ মানুষের, ডিএনএ প্রোফাইল।"
প্রাগৈতিহাসিক কালের কথা। (২০০৫-৬-৭-৮-৯-১০...), যখন আজকের 'এফবি স্টারদের' জন্ম হয়নি! ওসময় যারা অনলাইন—ব্লগস্ফিয়ারে লিখতেন, মাঠ কাঁপিয়ে 'ব্ল্যাক স্ট্যালিয়ন' দাবড়ে বেড়াতেন; তখন জনে-জনে বোঝাতে হত 'বোল্গার' জিনিসটা কী—খায়, না পান করে!
সেসময় দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বলে বসলেন, ব্লগাররা নাস্তিক! কী পরিমাণে জ্ঞানের স্বল্পতা থাকলে এবং কী পরিমাণ ধর্মীয় জ্ঞান না-থাকলে একটা মানুষ এহেন মন্তব্য করতে পারেন!
এ সত্য, ব্লগিংয়ের যে অভাবনীয় শক্তি তা অনেকের কাছে হয়ে গেল 'বানরের হাতে ক্ষুর'! বানর যেমন যাকে পায় তাকেই ক্ষুর দিয়ে পোচ দেয় এদের অনেকেই তাই শুরু করল! এদের পরিমাণ অবশ্য খুবই অল্প ছিল কিন্তু এরা লেখালেখির কফিনে পেরেক ঠুকল।
শেষ পেরেকটা ঠুকলেন 'খুনের উস্কানিদাতা' 'আমার দেশ'-এর মাহমুদুর রহমান। পশ্চাদদেশের ক্ষুদ্র ক্ষত চুলকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে দিলেন। এই অপদার্থের জানা নেই যে সব ছাপার অক্ষরে ছাপানো যায় না। যেমন টাট্টিখানা-রেস্টরুমের ভঙ্গি বাইরে আলোচনা করা চলে না!
ব্লগারদের নিয়ে মাহমুদুর রহমানের সেইসব ছাপার অক্ষরের তথ্যসূত্র সবই আমার কাছে সংরক্ষিত কিন্তু তা আবার এখানে টেনে এনে মাহমুদুর রহমানের মত অপদার্থ হওয়ার গোপন কোন ইচ্ছা আমার নাই। তবে এই লোক কেমন করে দাঁড়ি-কমাসহ ছাপাত তার একটা ছোট্ট নমুনা দেই:
দেখা গেল, ব্লগস্ফিয়ারে, একটা-কিছু কেউ লিখেছিল; হয়তো শতেক মানুষও পড়েনি। কিন্তু সেটা, 'খুনের উস্কানিদাতা মাহমুদুর রহমান' দাঁড়ি-কমা সহ তার পত্রিকায় ছাপিয়ে লক্ষ-লক্ষ পাঠকের হাতে তুলে দিল।
এই খুনের উস্কানিদাতা বিরাট মাওলানা মাহমুদুর রহমান নিয়ম করে হুবহু তা 'আমার দেশ' পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়া শুরু করল। এরপর একের-পর-এক ব্লগারকে [১] কোপানো শুরু হলো। প্রকাশককেও [২]!
সেসময়, এই কোপানোর সঙ্গে খুবই আলোচিত একটা নাম ছিল 'ফারাবী'। তখন ফারাবী এবং তার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে একটা খোলা চিঠি লিখেছিলাম:
কী ভীতিকর একটা অবস্থা! তখন, অনলাইন বই-বিক্রির প্ল্যাটফর্ম 'রকমারি' কোন প্রকার ব্যাখ্যা ব্যতীত অভিজিতের সমস্ত বই সরিয়ে ফেলল! অনেক কথা চালাচালির পরও যখন সদুত্তর দিতে পারল না। তখন আমি ওদের বললাম, এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদে বিক্রির জন্য ওদের বইয়ের লিস্ট থেকে যেন আমার বইও সরিয়ে ফেলে[৩]। তখন সম্ভবত আমার ১০/১২টা বই তাদের বিক্রির লিস্টে ছিল।
'রকমারি' তখন আমাকে বলল, এটা মুখে বললে তো হবে না; আনুষ্ঠানিক মেইল করেন। আমি আনুষ্ঠানিক মেইল করে নিষেধ করলাম।
আসলে ফারাবী না, এই সমস্ত খুনের উস্কানিদাতা হচ্ছে মাহমুদুর রহমান। এবং খুনের কারিগর হচ্ছে জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান মুফতি জসীমুদ্দীন রাহমানী:
২. অভিজিৎ রায়: https://www.ali-mahmed.com/2015/03/blog-post_23.html?m=1
৩. ফারাবী এবং রকমারী ডট কম: https://www.ali-mahmed.com/2015/03/rokomaricom.html?m=1
'[*]বাঞ্চো...ট্রাম্প' যে কী পরিমাণ চুতিয়া এর ভাল একটা উদাহরণ এটা:
এক-এগারো'র প্রয়োজন ছিল, কি ছিল না; এখানে এই আলোচনা জরুরি না। ওই সময়ের আলোচিত এক নাম 'জেনারেল মাসুদ'। এই নামেই মুখে-মুখে চালু ছিল নামটি। এটাও বলা হয়ে থাকে, সেনাপ্রধান মইনের স্থলে জেনারেল মাসুদ হলে এই দেশের ইতিহাস অন্য ভাবে লেখা হত! এই তর্কও থাকুক আপাতত।
এক-এগারো বা এর পরবর্তীতে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে হালে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালত রিমান্ডও মঞ্জুর করেছেন। তিনি কি অপরাধ করেছেন সেটা আদালতের বিচার্য বিষয়! ফায়ারিং স্কোয়াডে তিন-নলা বন্দুকে বিচার করা হবে নাকি মুক্তি দিয়ে হালুয়া-পুরি খাওয়ানো হবে, এই নিয়েও কোন সমস্যা নাই।
তো, ওসময়ও একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেত, আদালতে উত্থাপন করার সময় যে অনাচারগুলো করা হতো, পুলিশ কী করে? আচ্ছা, ভিয়েতকং গেরিলার মত ওরা কী পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে এই সমস্ত অনাচার করে নিমিষেই উধাও হয়ে যায়!
ওয়াল্লা, এরা তো ভিয়েতকং গেরিলা না! কী চমৎকার করে কোর্ট-চত্বরে মিডিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে এই লোক সাক্ষাৎকার দিচ্ছে, মাসুদকে কয়টা পচা ডিম মেরেছে, কোন এঙ্গেলে মেরেছে, কোন হাত দিয়ে...!
অনেকে নাক ঝেড়ে বলবেন, সমস্যা কোথায়? সমস্যা আছে, ভয়াবহ সমস্যা! কারণ জেনারেল মাসুদ, এই মানুষটা রাষ্ট্রের কাস্টডিতে ছিলেন। বিচারে শাস্তি দেওয়ার আগ-পর্যন্ত এই দেশের সমস্ত অস্ত্র, সব শক্তি এঁকে বা তার স্থলে অন্য যে-কাউকে রক্ষা করবে।
আমাদের এক অন্ধকার দিক, জেলহত্যা—ওই জেলহত্যা এবং জেনারেল মাসুদ বা অন্য কারো এমন হেনস্তা একই ধরনের অপরাধ! কতটুকু কম-বেশী সে ভিন্ন আলোচনার বিষয়!
আপনাদের কি মনে আছে গোলাম আজমের বিচার-ফাঁসির জন্য লক্ষ-লক্ষ মানুষ শাহবাগে জড়ো হয়েছিল। উত্তাল সমুদ্রের মত মানুষ!
বেশ-বেশ! তা গোলাম আজম তখন কোথায় ছিলেন? এই লক্ষ-লক্ষ মানুষের কাছ থেকে মাত্র পঞ্চাশ কদম দূরে। শাহবাগেই, হাসপাতালে। একটা করে পানির বোতল ছুড়ে মারলে গোটা হাসপাতাল ভেসে যেত!
এই পঞ্চাশ কদম কিন্তু কেউ অতিক্রম করার কথা কল্পনাও করেননি! এই পঞ্চাশ কদমের মাঝেই কিন্তু গোটা বাংলাদেশ হিমালয়ের মত দাঁড়িয়ে ছিল।
আর্মেনিয়ানদের বিলিয়ার্ড (আন্টা) খেলার জায়গা সংলগ্ন মাঠ ছিল বলে এর নাম ছিল 'আন্টাঘর'! কালে-কালে এর নাম হলো ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক!
১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর প্রহসনমূলক বিচারে ইংরেজ শাসকেরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে খুন করে। এরপর এই মাঠে তাঁদেরকে গাছে-গাছে ঝুলিয়ে দেয়! কাক ঠুকরিয়েছে, ঈগল চোখ গলিয়ে দিয়েছে কিন্তু কেউ লাশ নামাতে সাহস করেনি!
প্রায় একশো বছর পর এই নৃশংসতার স্মরণে এখানে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়:
আহা! যেটা করা যেত বিশাল একটা বিলবোর্ডে এই অভূতপূর্ব ঘটনা বড়-অক্ষরে লিখে, আমাদের সিপাহিরা গাছে-গাছে ঝুলছে এর প্রতীকী ছবি এঁকে রাখা।
অন্য ভুবনে কখনও ভ্রমণে গেলে ওই ভ্রমণের কঠিন নিয়ম হচ্ছে, ওখানে কোথাও অসঙ্গতি মনে হলেও 'এটা সরিয়ে-ওটা সরিয়ে' মাতব্বরি করা যাবে না। অযথা কিছুতেই হাত দেওয়া যাবে না! যেমন ধরুন, অকারণে আপনি ফট করে একটা কাক মেরে ফেললেন।
সর্বনাশ কিন্তু করে ফেললেন! ওখানেও একটা 'ট্রেরাম্প' আছে। প্রোগ্রামিংটা এভাবেই করা ছিল, যে কাকটাকে আপনি হত্যা করলেন সেই কাকটা ট্রেরাম্পের বালকবেলায় তার দু-চোখ গেলে দেবে। সে অন্ধ হয়ে গুলিস্থানের মত কোন-এক জায়গায় ভিক্ষা করবে।
কিন্তু এখন ফল হবে ভিন্ন, কালে-কালে ট্রেরাম্প বড় হবে এবং লক্ষ-লক্ষ মানুষ মেরে ফেলবে! প্রকারান্তরে আপনি একটা কাক হত্যা করে লক্ষ-লক্ষ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী হলেন।
যাই হোক, অন্য ভুবন বাদ এই ভুবনের কথা বলি। পাকিস্তান নামের দেশটার জনগণের কুৎসিত একটা অভ্যাস আছে। যত্রতত্র মুত্র-বিসর্জন করা। পার্লামেন্টে আইনবিদ দ্বারা আইন পাশ করার জন্য বিল উত্থাপিত হল:
যে বান... রাস্তায় মুত্র-বিসর্জন করবে তাকেই 'শুট-অন-সাইট'।
কিন্তু সংসদ সদস্যরা খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেলেন কারণ এদের মধ্যে একজন চৌকশ সামরিক কর্মকর্তাও আছেন। তাকে গুলি করা হবে, কি হবে না? এরিমধ্যে পার্লামেন্টে একটা গাধা ঢুকে পড়ে:
ওরি আল্লাহ, আবার দেখি ভবনের ছবি তোলাও নিষেধ! এমনিতে কোন ভবনের ছবি তুললে সেটা হুড়মুড় করে দাঁড়ানো থেকে বসে গেছে বা লম্বা হয়ে শুয়ে পড়েছে এমনটা তো দেখিনি, শুনিনি! কে জানে, হতেও পারে এমনটা, বঙ্গালদেশ বলে কথা!
এমনিতে আমি ভয়ে-ভয়ে আছি! ছবি তুলে এই যে অপরাধটা করলুম তখন তো ওরা আমার নাগাল পায়নি এখন কী এই অপরাধে আমার বাসস্থান লক্ষ করে কামান দাগবে?
এই শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক প্রধানমন্ত্রীর একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়া সবার সংগে পরিচিত হন।
একটা গুরুতর কিন্তু আছে! সবাই উঠে হোস্ট এবং প্রধানমন্ত্রীকে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়েছেন কিন্তু ব্যতিক্রম কেবল আব্দুর রাজ্জাক! তিনি সব কর্মকান্ড বসে-বসে করেছেন!
এটা খুবই সাধারণ শিষ্টাচার—কেউ আপনার সংগে দাঁড়িয়ে কথা বললে আপনি দাঁড়িয়ে কথা বলবেন। অবশ্য যাদের পা নাই তাদের জন্য এই শিষ্টাচার খাটে না। যতদূর জানি আব্দুর রাজ্জাক সাহেব আল্লাহর রহমতে সুস্থ-সবল একজন মানুষ—আলহামদুলিল্লাহ।
হয়তো ধর্মীয় আচারের কারণে তিনি এটা করেননি! জেনে ভাল লাগল।
এমনিতে আমাদের এই ধর্মীয় শিক্ষক আমাদেরকে যা শিক্ষা দেন:
"নারীর জন্ম কলঙ্ক... অমঙ্গল...কুলক্ষণ...নারীর আত্মা নেই...স্বামী স্ত্রীকে বিক্রি করতে পারে...স্ত্রী হচ্ছে বাড়ির সম্পদ...!"
সবিনয়ে বলি, আমি ধর্মীয় শিক্ষক মহোদয়ের সাথে একমত হতে পারছি না। নারীর জন্ম না-হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমস্যা নাই কারণ তিনি তার জন্ম বায়োলজিক্যাল বলে মনে করেন না!
এমন অসংখ্য বয়ান আছে এই ভদ্রলোকের। একটা আরেকটাকে ছাড়িয়ে যায়!
অথচ নবীর সময়ে একজন নারী নবীকে লক্ষ করে ছোড়া তীর নিজের উপর নিয়ে নবীকে রক্ষা করেন [১]। তীর কোথায় চলে, রান্নাঘরে নিশ্চয় না?
আমার হাজার-হাজার লেখার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে শতশত লেখা আছে কিন্তু একটা লেখাও সাবেক প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবর রহমান বা জিয়াউর রহমানের স্তুতি-লেখা নাই! তাঁদের প্রতি অশ্রদ্ধার কারণে এমনটা কিন্তু না। এই বিষয়ে আমার সবিনয় যুক্তি হচ্ছে, এঁদের নিয়ে লেখার জন্য হাজার-হাজার লোক আছেন।
আমি না-হয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধে একজন শুয়োর-চড়ানো বীরপ্রতীক, একজন সুইপার, একজন ঠেলা-চালানো কমান্ডো এদের নিয়েই লিখলাম [১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৩, ১৪ ১৫]
এ সত্য, সাহিত্য মানেই যেমন ইংরাজি ভাষার সাহিত্য, মুভি মানেই যেমন হলিউডের তেমনি মুক্তিযুদ্ধ মানেই আওয়ামী লীগ। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামীলীগ-করা অধিকাংশ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে অবদান নেই!
কী অদ্ভুত একটা দেশ!
৭ মার্চের ভাষণ কেবল আওয়ামী সম্পত্তি বা দেশের সম্পত্তি না, এই ঐতিহাসিক ভাষণ ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো কর্তৃক “মেমোরি অফ দি ওয়ার্ল্ড” (Memory of the World) বা বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
-সূত্র:
১. সাদী মহাম্মদ: http://www.ali-mahmed.com/2013/07/1971.html